সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ, স্বার্থরক্ষা করে চুক্তি হোক

আওয়ামী লীগের সময় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে জ্বালানি খাতকে মূল নিশানা বানানো হয়। বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং এ বিষয়ে কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে না পারার আইন পাস করে নির্বিচার অর্থ লোপাট করা হয়।

দেশে তেল-গ্যাস এবং অন্যান্য খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিলেটের একাধিক গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে গভীরতর কূপ খনন করা হচ্ছে। সবশেষে গত সপ্তাহে সমুদ্রসীমার ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের ফলে দেশের জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে দেশে তেমন কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়নি। আওয়ামী লীগের সময় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে জ্বালানি খাতকে মূল নিশানা বানানো হয়। বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং এ বিষয়ে কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে না পারার আইন পাস করে নির্বিচার অর্থ লোপাট করা হয়। দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানী সরকারি প্রতিষ্ঠান-পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে বিদেশ থেকে চড়া দামে গ্যাস ও তরলীকৃত গ্যাস আমদানি করা হয়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে শুধু বসিয়ে বসিয়ে জনগণের লাখো কোটি টাকা দেয়া হয় ক্যাপাসিটি চার্জের নামে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া হয়। চুক্তিগুলো এমনভাবে করা হয়, যার রেশ এখনো টানতে হচ্ছে। কিন্তু এতে জ্বালানি খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরিবর্তে আরো বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সব দিক থেকেই দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। জনগণের অর্থের অপচয় রোধ হবে। নিজস্ব তেল-গ্যাস উত্তোলনে আমদানির অর্থেরও সাশ্রয় হবে। সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান শুরু করা হবে আগামী বছর, অর্থাৎ— ২০২৭ সালের মধ্যে। যোগ্য কোম্পানির সাথে গ্যাস উত্তোলনে ২৫ বছর এবং তেল উত্তোলনে ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি হতে পারে। জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত নিজ নিজ এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলন করে ইতোমধ্যে রফতানিও করছে। অথচ আমাদের এখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করা হয়েছে।

আওয়ামী আমলে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে একবার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তবে কোনো বিদেশী কোম্পানি তাতে সাড়া দেয়নি। সরকারের ওপর তাদের আস্থা ছিল না। বিএনপি সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে সমুদ্রে অনুসন্ধানের জন্য অন্তত ৯ বছর সময় লাগবে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক জরিপ— ইত্যাদি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনুসন্ধানে মোট ৯ বছর সময় লাগবে। এরপর কূপ খননে সময় দেয়া হবে দুই বছর। পরের তিন বছরের মধ্যে যেতে হবে উৎপাদনে। টেন্ডার জয়ী কোম্পানির সাথে গ্যাস উত্তোলন ও ভাগ-বণ্টনের চুক্তির বিষয়গুলোও প্রকাশ করা হয়েছে। এখন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে এগুলো চূড়ান্ত করা হবে— এটিই প্রত্যাশিত। বলা দরকার, এর আগে ১৯৯৩ সালে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রথম উদ্যোগ নেয় বেগম খালেদা জিয়ার সরকার। এখন তারেক রহমানের সরকার দেশের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করে বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তি করবে— এটিই প্রত্যাশা।