ছায়া মন্ত্রিসভায় জবাবদিহি নিশ্চিত হয়

টেকসই সংসদীয় ধারার সূচনা হোক

দমন-পীড়ন অধিকার হরণের দীর্ঘ অস্থিরতার পর বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন হতে যাচ্ছে। এ সরকারের কাছে মানুষের উচ্চ আশা— ঘৃণা বিভক্তির পুরনো সংস্কৃতি বন্ধ করবে। সমঝোতা নিরাপত্তা ও শান্তির মসৃণ গণতান্ত্রিক পথ রচনা করবে। আসন্ন সরকারের প্রধান তারেক রহমান সরকার গঠনের আগে ভাবি বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এবং জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা নাহিদ ইসলামের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সৌহার্দপূর্ণ সরকার পরিচালনার বার্তা দিলেন। এ অবস্থায় আগামীর সরকারকে আরো দক্ষ ও কার্যকর করে তুলতে হলে বিরোধীদের অর্থপূর্ণ ভূমিকার দরকার আছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আলাপ উঠেছে। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ধারায় এটি একটি ইতিবাচক সংযোজন হতে পারে।

দেড় দশকের শেখ হাসিনার শাসনে পিষ্ট মানুষ সুশাসনের আশায় মুখিয়ে আছেন। ভাবি সরকারি দলের পক্ষ থেকে সম্প্রীতির বার্তা ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। তারা ইনসাফের শাসন কায়েম করবেন। বিরোধী দলের সক্রিয় ভূমিকাও দেখতে চান জনগণ। পুরনো জ্বালাও-পোড়াওয়ের বদলে গঠনমূলক রাজনীতি উপহার দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বিরোধী দল। এক্ষেত্রে তারা ছায়া সরকার গঠন করে সংসদীয় রাজনীতিকে ইতিবাচক ধারায় প্রবাহিত করার উদ্যোগ নিতে পারে। জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক এ ধরনের কিছু বলা না হলেও দলটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ছায়া সরকার গঠনের বিষয়টি সামনে এসেছে।

ছায়া মন্ত্রিসভা ধারণাটি এসেছে ওয়েস্টমিনিস্টার ধারার সরকার-ব্যবস্থা থেকে। সেখানে মন্ত্রিসভার বিপরীতে বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে। এর সদস্যরা মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্যের বিপরীতে ছায়ার মতো ভূমিকা নেয়। বিরোধীদের মধ্য থেকে দক্ষ যোগ্য উদ্যমী ও নেতৃস্থানীয়রা এর সদস্য হন। আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, সরকারি তহবিলের ব্যবহার ও সরকার পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে ত্রুটি-বিচ্যুতি পর্যালোচনা করেন তারা। সরকারের অনিয়ম-অদক্ষতা ও দুর্নীতির বিষয় সামনে আনেন। তুলনামূলক ভালো বিকল্প প্রস্তাব করার প্রতিযোগিতা করেন। এতে করে মন্ত্রিসভার সদস্যরা সবসময় একটা নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকেন। নৈতিক সততার ঘাটতি থাকলে সতর্ক হন। অনিয়মের বিষয়েও সাবধান হন। অদক্ষতা অযোগ্যতা থাকলে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। এতে সংসদীয় সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক ও অংশগ্রহণমূলক হয়। এ ছাড়া সরকার পরিচালনায় ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ যোগ্যদের এ প্রক্রিয়ায় অনুশীলনও হয়।

উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর চল আছে। কিছু দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী এটি গঠিত হয়। সরকারি কোষাগার থেকে তাদের বেতন-ভাতা দেয়া হয়। ব্রিটেনে তাদের পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হয়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে এর চর্চা করতে পারে। বেতন-ভাতা না পেলেও কাজটি গণমানুষের পক্ষ যাবে। নিঃসন্দেহে একে তারা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে।

বিগত দিনে বাংলাদেশের সংসদে জয়ীরা এককভাবে সব ক্ষমতা ও সুবিধা নেয়ার নীতি নিয়েছেন। বিরোধীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছেন। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে এ সংস্কৃতি বদলাতে হবে। আসন্ন সংসদের সরকার ও বিরোধী দল উভয় পুরনো ধারা পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে। উভয়পক্ষকে কাজের মাধ্যমে এর প্রমাণ দিতে হবে।