মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, বিকল্প উৎস-জনসচেতনতা দরকার

ইরানে মার্কিন-ইসরাইল হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। গত সোমবার বন্ধ হয়ে গেছে সৌদি আরবে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় শোধনাগার। একই দিনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করেছে কাতার। এদিকে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালীও বন্ধ। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সঙ্কটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ সহসাই বন্ধ না হলে সঙ্কট তীব্রতর হবে। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো বিপাকে পড়বে।

উদ্বেগের বিষয়— আমাদের জ্বালানির সরবরাহ ঠিক না থাকলে দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে অর্থনীতি থমকে যাবে। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়; বরং একটি দেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও জনজীবনের স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি। জ্বালানি সঙ্কট এমনিতে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ। এর ওপর ইরানে মার্কিন-ইসরাইল অন্যায় হামলা সমস্যা জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি আছে, গ্যাসের সরবরাহও সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন নতুন চাপে পড়বে। বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। আর গ্যাসচাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ করে আমদানি করা এলএনজি, তার বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য আমাদের জ্বালানি সংগ্রহের প্রধান উৎস। তাই জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এ জন্য তেল-গ্যাস সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশে শিল্প, পরিবহন ও গৃহস্থালি ব্যবস্থার বড় অংশ নির্ভর করে গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের ওপর। কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারেও গতি নেই। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর জেরে অনেক সময় লোডশেডিং হয়, যা শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ভোগান্তি বাড়ায়।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধে জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দ্রুত বিকল্প বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানির মজুদ গড়ে তুলতে হবে। যাতে আপৎকালে বিপদে পড়তে না হয়। তবে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনার বিকল্প নেই। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা আরো বেশি করে কাজে লাগানো উচিত। দ্বিতীয়ত, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ বাড়ানো। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা।

জ্বালানি সঙ্কট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। এখনই সময় দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণের। সেই সাথে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তবে জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোও একটি বড় বিষয়। যেমন— অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং বিকল্প শক্তির উৎস গ্রহণে নাগরিক সাধারণ বর্তমান এই সঙ্কট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।