সর্বজনীন পেনশন স্কিম নিঃসন্দেহে একটি মহৎ জনকল্যাণমূলক ধারণা। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি এটি; কিন্তু আমাদের দেশে এ স্কিম চালুর পর এই অল্প সময়ের মধ্যে কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট অপ্রস্তুত অবস্থায় রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের মতলবে পতিত শেখ হাসিনা সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করে; কিন্তু এখনই মুখ থুবড়ে পড়েছে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ কার্যক্রম। চালুর সময় পতিত আওয়ামী সরকার ‘ঢাক-ঢোল’ পিটিয়ে বলেছিল, সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-বিভিন্ন বাহিনী, শিক্ষকসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষকে এর আওতায় আনা হবে। দেখা যাচ্ছে, চালুর তিন বছরের মাথায় কয়েক লাখ সাধারণ মানুষ ছাড়া সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-শিক্ষকদের এর আওতায় আনা যায়নি।
সমতা, সুরক্ষা, প্রগতি ও প্রবাস- চারটি স্কিমের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হয়। নতুনভাবে যুক্ত করা হয় ‘প্রত্যয়’ স্কিম। এ স্কিমে শুধু স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং এসবের অধীনস্থ অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতে যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী ২০২৪ সালের পয়লা জুলাই ও তার পরে যোগদান করবেন, তাদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। অবশ্য পরে ওই বছর ২ আগস্ট প্রত্যয় স্কিম বাতিল করা হয়।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, গত ২০ মাসে এ কর্মসূচির আওতায় মাত্র পাঁচ হাজার ১৭৪ জনকে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রথম বছরে প্রতিদিন যেখানে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে চার-পাঁচ হাজার মানুষ নিবন্ধন করতেন, গত দুই বছর ধরে তা কমে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এমনকি মাসের পর মাস একজন গ্রাহকও এই স্কিমে যুক্ত হননি। অন্য দিকে যারা আগে প্রতি মাসে কিস্তির টাকা দিতেন, আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় তাদের বেশির ভাগ এখন আর চাঁদাও দেন না। এর প্রধান কারণ এই স্কিমের সাথে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়া। এসব প্রতিষ্ঠানের চাকুরেদের জন্য নির্ধারিত ‘প্রত্যয়’ স্কিমটি অন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে সার্কুলার জারি করে প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। ফলে পুরো স্কিম বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে পড়ে। স্কিম সফল তো হয়ইনি; বরং দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্কিমটি চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্কিমটি চালিয়ে নিতে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সরকারকে। বাস্তবে কিছু অবসরভোগী কর্মকর্তার ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কিম ব্যর্থ হলেও এর পরিচালনায় গঠিত ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষে’র কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বহন করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত মঙ্গলবার সর্বজনীন পেনশন স্কিম-বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় বসেন।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ব্যর্থতার কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে নীতির অসামঞ্জস্য। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি ছাড়া, সর্বজনীন পেনশন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।
সরকারি চাকুরে ও শিক্ষকরা এ কর্মসূচির আওতায় আসার ঘোর বিরোধী; কিন্তু আইনে ছিল এ স্কিমে তাদের প্রথমে নিয়ে আসা হবে। সঙ্গত কারণে এ কর্মসূচির পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।



