দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক বিশেষ নাজুক সময়ে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে পরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব গঠন করে। সে সময় এই বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য অনেকটা সফল হলেও এই বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনা হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার সেসব সমালোচনা আমলে না নিয়ে র্যাবের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। পরে আওয়ামী লীগ সরকারও র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; বরং এই বাহিনীকে গুম-খুনসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছে। র্যাব শুধু হাসিনা সরকারের হয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই করেনি, ব্যক্তিগতভাবেও র্যাব সদস্যরা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন ছিল র্যাবের তেমনি একটি অপরাধ। রাষ্ট্রীয় বাহিনী র্যাব যেন দানবে পরিণত হয়। এসব কাজের জন্য সংস্থা হিসেবে র্যাব ও র্যাবের মহাপরিচালকসহ সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে দেশী-বিদেশী নানা মানবাধিকার সংস্থা র্যাবের বিলুপ্তির দাবি তোলে। এমনকি জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানায়।
এমতাবস্থায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার র্যাব বিলুপ্ত না করে শুধু নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সাথে র্যাবের কালো পোশাকও পরিবর্তন করা হবে। সংস্থাটির নতুন নাম হবে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা এসআইএফ। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, র্যাব পুনর্গঠনের জন্য প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন-বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আব্দুল হাফিজকে সভাপতি করে একটি কমিটি হয়েছিল। সেই কমিটি র্যাবের নতুন নামের সুপারিশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা সেটি অনুমোদন করেছেন। বাহিনীর কার্যক্রম নতুনভাবে শুরু হবে।
কোনো বাহিনীর নাম পরিবর্তনের একটি প্রথা চালু হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের পর এর নাম পরিবর্তন করে বিজিবি রাখা হয়। কিন্তু নাম পরিবর্তন করলেই একটি বাহিনী পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে— এমন নয়। র্যাবকে সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এর কাঠামোগত সংস্কার দরকার। র্যাব গঠন করা হয়েছে পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে। কিন্তু র্যাবের কাজ যেহেতু আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সেহেতু এ বাহিনীর সাথে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততার দরকার নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি দুর্বল গণতন্ত্রের লক্ষণ হিসেবেই পরিগণিত। এতে করে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্বও নষ্ট হয়। র্যাব থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বাদ দিয়ে এটিকে শুধুই পুলিশের একটি বিশেষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
র্যাবে থেকে যারা অপকর্ম করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। অপরাধের বিচার ভবিষ্যতে র্যাবের সদস্যদের অপরাধ প্রবণতা রোধে কাজ করবে।
র্যাবে কাজ করা সদস্যদের নৈতিক দিকটিও সরকারের লক্ষ রাখা উচিত। বাহিনীর সদস্যরা যাতে উচ্চ নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে কাজ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। বাহিনীর সদস্যদের নৈতিক পদস্খলন রোধে সর্বদা এ জাতীয় প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা দরকার।
নাম পরিবর্তনের সাথে র্যাব যদি চরিত্রগতভাবে বদলে গিয়ে গণমানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারে, তবেই কেবল তার নতুন নাম ধারণ সার্থক হবে।



