হারিয়ে যাচ্ছে দেশের সব নদ-নদী, দখল-দূষণ রোধে ব্যবস্থা নিন

নদী মরে যাওয়ায় আমাদের জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা আগের চেয়ে তীব্রতর হচ্ছে। রোগ-ব্যাধির বিস্তার ঘটছে। এ বিষয়ে পানিসম্পদ, পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় করে তোলা জরুরি।

দেশের নদ-নদীর অবস্থা করুণ। বেশির ভাগ নদী মরে গেছে। যেগুলো টিকে আছে সেগুলোও মৃতপ্রায়। এক সময় যে দেশে প্রায় দেড় হাজার নদ-নদী ছিল, সেখানে এখন আছে আড়াই শ’র মতো। নদী মরে যাওয়ার কারণ দুই ধরনের। প্রাকৃতিক বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক নদী মরে যায়। এ বিষয়ে করণীয় থাকে সামান্যই। আবার দখল-দূষণের মতো মানুষের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডেও নদী মরে যায়। দখল-দূষণ রোধ করা সম্ভব। এ দায়িত্ব মূলত সরকারের। প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এর সাথে জড়িত মানুষের দৈনন্দিন জীবনও। অনেকের জীবিকা নদীনির্ভর। কৃষকের ফসল উৎপাদনে সেচ দেয়া হয় নদী থেকে। অনেকের নিত্যদিনের পানির চাহিদা পূরণ করে নদী। যাতায়াত, পণ্য পরিবহনের মতো নানা প্রয়োজনে আমরা নদীর ওপর নির্ভর করি। ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশের জন্যও নদী গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই নদী আমরা রক্ষা করতে পারছি না।

জলবায়ু পরিবর্তন অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নদীর জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু তার চেয়েও বড় অভিশাপ হয়ে উঠেছে নদীতে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নেয়ার ঘটনা। বাংলাদেশের প্রায় সব যৌথ নদীতে অসংখ্য বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে উজানের প্রতিবেশী দেশ ভারত। ওই ভারতের সহায়তা নিয়েই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। অথচ দেশটি আমাদের পানিতে শুকিয়ে মারলেও আন্তর্জাতিক ফোরামে নালিশ করার শক্তি নেই। তবে দখল-দূষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। অনেক নদী মরে গেছে শুধু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলদারিত্বে। তারা নদী দখল করে সেখানে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, মার্কেট অথবা কারখানা। অনেক নদীতে অবাধে ফেলা হয় কল-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য। এসব দেখার জন্য সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, সংস্থা আছে। কিন্তু তারা দায়িত্ব পালনে আন্তরিক নয়। দখল রোধে মাঝে মধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী হয় না। ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনকালে ক্ষমতাসীনরা অবাধে নদী দখল করেছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা দায়িত্বহীন তার নমুনা পাওয়া গেল দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক রিপোর্টে। এতে বলা হয়- জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, যৌথ নদী কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অনেক সংস্থা থাকলেও তারা কেউ দেশের মোট নদীর সংখ্যা কত জানে না। নদ-নদীর বর্তমান অবস্থাও ওয়াকিবহাল নয়।

এদিকে নদীর সাথে সাথে কমছে পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে সাশ্রয়ী নৌপথও। স্বাধীনতার পর যেখানে নদীপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। এখন তা মাত্র আট হাজার কিলোমিটার।

নদী মরে যাওয়ায় আমাদের জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা আগের চেয়ে তীব্রতর হচ্ছে। রোগ-ব্যাধির বিস্তার ঘটছে। এ বিষয়ে পানিসম্পদ, পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় করে তোলা জরুরি। একই সাথে ভারতের সাথে বোঝাপড়ার দরকার আছে। দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে কূটনীতির সুযোগ নিতে হবে পূর্ণ মাত্রায়। তাতে কাজ না হলে বহুপক্ষীয় পর্যায়ে যেতে হবে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ফোরামে। প্রাপ্য আদায়ে ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের অবস্থান সব সময়ই সুবিধাজনক।