মেট্রোরেলের তিন ক্রয়প্রস্তাব প্রত্যাহার

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষা পাক

মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন সক্ষমতার প্রমাণ। এজন্য এর প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনটি ক্রয়প্রস্তাব পুনঃযাচাইয়ের সিদ্ধান্ত তাই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ, দ্রুত ও পেশাদার মূল্যায়নের মাধ্যমে জনগণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রকল্পে স্বচ্ছতার সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী করা।

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের তিনটি ক্রয়প্রস্তাব শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। গত বুধবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপনের কথা ছিল। বৈঠক শুরুর আগে সেগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা যৌথভাবে এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে নয়া দিগন্তের খবরে বলা হয়েছে, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব-ডিপিপি অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েকটি প্যাকেজে শত শত থেকে হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছিল। ব্যয়ের যৌক্তিকতা, দরপত্র মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য আরো যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর প্রস্তাবগুলো আবার ক্রয় কমিটিতে উপস্থাপন করা হতে পারে।

ঢাকার উত্তর নদ্দা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮ কিলোমিটার মেট্রোরেল লাইন ও স্টেশনের নির্মাণকাজ অনুমোদিত মূল ডিপিপির তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি অর্থাৎ- ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল; যা মূল বাজেটে চার হাজার ৫৮২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা নির্ধারিত ছিল।

বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প আমাদের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো উদ্যোগ। এ ধরনের প্রকল্পে প্রতিটি ক্রয়, চুক্তি ও ব্যয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ প্রেক্ষাপটে মেট্রোরেলের তিনটি ক্রয়প্রস্তাব প্রত্যাহার করে পুনঃযাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে সামান্য অনিয়ম বা প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি, প্রকল্পের সুনামহানি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোনো অভিযোগ, অসঙ্গতি বা প্রক্রিয়াগত দুর্বলতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা সুশাসনের অংশ। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হয়।

উল্লেখ্য যে, জাইকার মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও দুর্নীতিবিরোধী নীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। ফলে পুনঃযাচাইয়ের উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের প্রতিশ্রুতিরও প্রতিফলন। এতে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সহযোগিতায়ও বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরো সুদৃঢ় হবে। তবে পুনঃযাচাই যেন অযথা দীর্ঘসূত্রতায় পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা দরকার। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বার্থে এটি করতে হবে।

মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন সক্ষমতার প্রমাণ। এজন্য এর প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনটি ক্রয়প্রস্তাব পুনঃযাচাইয়ের সিদ্ধান্ত তাই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ, দ্রুত ও পেশাদার মূল্যায়নের মাধ্যমে জনগণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রকল্পে স্বচ্ছতার সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী করা।

ক্রয়প্রস্তাবগুলো পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়ায় ব্যয়ের যৌক্তিকতা পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন সুশাসন নিশ্চিত করে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় কতটা কমে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মানদণ্ড কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই দেখার।