বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে স্টার্টআপের নাম বারবার উঠে আসছে। স্টার্টআপ বলতে এমন একটি নতুন ব্যবসা বোঝায়, যা সাধারণত নতুন কোনো আইডিয়া, পণ্য বা সেবা নিয়ে শুরু হয়। সেই সাথে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার লক্ষ্য থাকে। সহজভাবে বললে— স্টার্টআপ হলো নতুন ব্যবসা, নতুন আইডিয়া ও দ্রুত বড় হওয়ার পরিকল্পনা।
স্টার্টআপের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ তরুণদের শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে না, বরং নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনে সমাজের নানা সমস্যার সমাধানও দিচ্ছে। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্টার্টআপ দ্রুত বিকাশমান একটি খাত, যা দেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক।
স্টার্টআপের মূল শক্তি নতুনত্ব ও উদ্ভাবন। প্রচলিত ব্যবসার বাইরে গিয়ে নতুন কোনো ধারণা বাস্তবে রূপ দেয়ার পদক্ষেপ স্টার্টআপকে আলাদা করে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিতে আজ ছোট একটি আইডিয়াও খুব দ্রুত বৃহৎ পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। ই-কমার্স, ফিনটেক, হেলথটেকসহ বিভিন্ন খাতে তরুণ উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। তবে স্টার্টআপের উজ্জ্বল দিকের পাশাপাশি আছে কিছু চ্যালেঞ্জ। যেমন— অর্থায়নের অভাব, অভিজ্ঞতার ঘাটতি, বাজার সম্পর্কে অপর্যাপ্ত ধারণা এবং নীতিগত জটিলতা। এগুলো অনেক সময় সম্ভাবনাময় উদ্যোগও থমকে দেয়। ফলে শুধু উদ্ভাবনী চিন্তা নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও সঠিক দিকনির্দেশনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নয়া দিগন্তের খবর, দেশে স্টার্টআপ এবং নতুন উদ্যোগের প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ প্রবণতা শুধু নতুন ব্যবসার বিকাশ ঘটাচ্ছে না, বরং কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সর্বশেষ সরকারি-বেসরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নতুন রেজিস্ট্রেশন হওয়া স্টার্টআপের সংখ্যা ১২ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি (অ্যাগ্রি-টেক), স্বাস্থ্যসেবা এবং ই-কমার্স খাতে এ বৃদ্ধি বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ ২০২৫ সালে মোট নতুন উদ্যোগের প্রায় ৪৫ শতাংশ। দেশে প্রযুক্তি স্টার্টআপে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা নতুন আইডিয়া ও উদ্ভাবনী সমাধানে আগ্রহী। এতে শুধু ব্যবসা নয়, নতুন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চাহিদাও বাড়ছে। ফলে স্টার্টআপ এবং নতুন উদ্যোগ বৃদ্ধি কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নতুন উদ্যোগগুলো ফ্রিল্যান্স এবং দূর-অফিস কাজের সুযোগও তৈরি করছে।
‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ নীতি ২০২৪’ অনুযায়ী, নতুন উদ্যোগগুলো কর সুবিধা, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণে সহায়তা পাচ্ছে। পরিবর্তিত নীতি এবং ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থায় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ২০২৫ সালে এ খাতে ২০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। বিনিয়োগকারীদের মতে, বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনাময়। এখানে যুবসমাজ সৃজনশীল এবং দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। ফলে স্থানীয় উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্টার্টআপ খাত এগিয়ে নিতে হলে সরকারি সহায়তা, বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। উদ্যোক্তা বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেয়া দরকার, যাতে তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।
স্টার্টআপ কেবল একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়; এটি একটি মানসিকতা, যা নতুন কিছু করার সাহস জোগায়। সঠিক পরিকল্পনা, সহায়তা ও পরিবেশ পেলে স্টার্টআপ হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে ঝুঁকি সঠিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি থাকতে হবে।



