আইনসভার প্রথম অধিবেশন, সংসদ হোক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সংবিধান ও কার্যপ্রণালী-বিধি অনুযায়ী চলে। সরকার ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সাধারণত স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পরিচালনায় কোরাম পূর্ণসাপেক্ষে সংসদের অধিবেশন পরিচালিত হয়। সংসদীয় কার্যপ্রণালী-বিধি (রুলস অব প্রসিডিউর) অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর বিতর্কের মাধ্যমে আইন প্রণয়নসহ সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

সংসদ সদস্যরা মন্ত্রীদের প্রশ্ন করেন। প্রশ্নের জবাব দিয়ে সরকার তার জবাবদিহি নিশ্চিত করে। আইন প্রণয়ন : বিল উত্থাপন, আলোচনা, যাচাই এবং ভোটের মাধ্যমে আইন পাস হয়। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাধীনতা-উত্তর সংসদীয় শাসনব্যবস্থার ধারা প্রবর্তন করা হলেও পঁচাত্তরে এসে শেখ মুজিবুর রহমান তা পরিবর্তন করে একদলীয় রাষ্ট্রপতির শাসন প্রবর্তন করেন। জবাবদিহির সংস্কৃতি বিদায় করেন।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে দ্বিতীয় দফায় সংসদীয় সরকার-ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। সংসদ একটি স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান, যেখানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে সংসদীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা। এটি কখনো সেভাবে সুস্থ ধারায় বিকশিত হয়নি। সংসদীয় শাসন-ব্যবস্থা এ দেশে টেকসই ভিত পায়নি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বপর্যন্ত শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় নামকাওয়াস্তে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে দুঃশাসন বলবৎ ছিল। পতিত হাসিনা প্রধান বিরোধী দলকে প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে পর পর তিনটি তামাশার সংসদ গঠন করে সংসদীয় রাজনীতির বারোটা বাজান।

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের পর ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠন করেছে। জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির আদেশে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। তবে বর্তমান রাষ্ট্রপতির অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রশ্ন রয়েছে। তবু এবারের সংসদ আগের গতানুগতিক কোনো সংসদের মতো নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সংস্কারের যে জন-আকাঙ্ক্ষা তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রয়েছে এর ওপর। জুলাই সনদের আলোকে তা হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকার প্রণিত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এ সনদ সংসদে পাস করানোর দায় রয়েছে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। কিন্তু নতুন সংসদ সদস্যদের মধ্যে সরকারি দল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ শপথ না নেয়ায় এতে ছন্দপতন ঘটেছে। ফলে সংসদে জুলাই সনদ পাস করা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে জুলাই সনদের বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধীরা জোরালো অবস্থান নেবে।

সরকারি দল বিএনপি সংসদকে প্রাণবন্ত এবং জবাবদিহিমূলক করার ইতিবাচক মানসিকতার কথা বলছে। ডেপুটি স্পিকার পদটি বিরোধী দলকে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ত্রয়োদশ সংসদ সম্পূর্ণ এক ব্যতিক্রম। বিপ্লব-পরবর্তী গঠিত এই সংসদের দিকে দেশবাসী তাকিয়ে আছে। আগের মতো এটি যেন অকার্যকর অর্থহীন এক সংসদে পরিণত না হয়। দেশের সব সঙ্কট আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে যেন এ সংসদ। নতুন বাংলাদেশে সংসদীয় যাত্রা শুভ হোক।