সুদূর অতীতে আমাদের বস্ত্রশিল্প বিশ্বব্যাপী সমাদ্রিত ছিল। সে সময়ের মসলিনের কথা এখনো সবার মুখে মুখে। বর্তমানেও বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত। স্থানীয় কারখানাগুলো সচল রাখা গেলে ১০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে। একই সাথে ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কমবে। কিন্তু এতদিন রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে এ খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। বিশেষ করে কাঁচামাল তুলা আমদানিতে ভারতনির্ভরতা বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্য উৎস থেকে তুলা আমদানিতে মনোযোগী হয়েছেন দেশীয় বস্ত্রশিল্প মালিকরা। এই প্রবণতা এ খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ, যার মূলচালিকা শক্তি রফতানিমুখী টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বস্ত্রকারখানা মালিকরা ক্রমে ভারতীয় তুলা থেকে সরে আসছেন। গুণগত মানের ধারাবাহিকতা না থাকা, দামের অস্থিরতা, রফতানি নীতিতে অনিশ্চয়তা এবং মানসংক্রান্ত উদ্বেগে গত চার বছরে ভারত থেকে তুলা আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য, ২০২১ সালে বাংলাদেশে তুলা আমদানিতে ভারতীয় বাজারের অংশ ছিল ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে ভারত ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী দেশ। তবে ২০২৫ সালে এসে সেই অংশীদারত্ব ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এছেছে।
ভারতীয় তুলা আগে বাংলাদেশের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হলেও গত কয়েক বছরে রফতানি নীতি বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এখন কারখানাগুলো নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। এ প্রেক্ষাপটে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার তুলার দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত। ২০২৫ সালে ব্রাজিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। একই সাথে উচ্চমানের ও দূষণমুক্ত তুলার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ভারত থেকে তুলা আমদানি হ্রাসের মূল কারণ- দেশটির সরকারের আকস্মিক রফতানি নিষেধাজ্ঞা, কোটা আরোপ এবং নীতিগত পরিবর্তনে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পাশাপাশি তুলার গুণগত মান দুর্বল এবং দামের অস্থিরতাও ভারতীয় তুলা আমদানি কমার বড় কারণ।
ভারতীয় সুতার আমদানি কমলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর অবিক্রীত সুতা বিক্রির সুযোগ বাড়বে। বর্তমানে অনেক দেশীয় মিলে বিপুল পরিমাণ সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। সেই সাথে ভারত থেকে কম দামি সুতার ‘ডাম্পিং’ বন্ধ হলে দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে।
তবে ভারতীয় সুতা স্থানীয় সুতার চেয়ে কেজিপ্রতি ৩০-৫০ সেন্ট সাশ্রয়ী। আমদানি কমলে বা শুল্ক বাড়লে পোশাকের উৎপাদন খরচ ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ ছাড়া সস্তা সুতার অভাব এবং স্থানীয় সুতার চড়া দামে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
ভারতীয় সুতা আমদানি কমিয়ে দেয়ার যে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প মালিকরা নিয়েছেন তাতে সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো হবে। এই নীতিতে দেশীয় বস্ত্রশিল্প মালিকরা যাতে অটুট থাকতে পারেন, সেজন্য সরকারকে তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।



