শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিন আসক্তি

আক্রান্ত প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে

শিশুদের রক্ষা করতে হলে এখনই বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য সরকারেরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তার চেয়েও বড় দাগে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। গণমাধ্যমে প্রচার কর্মসূচি নিতে হবে। দেশবাসীকে এ নিয়ে সচেতন করতে হবে। অন্যথায় আমরা একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রজন্ম পাবো ভবিষ্যতে।

ডিজিটাল স্ক্রিন আসক্তি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সব বয়সীরা মোবাইলে দিনের বড় একটি সময় কাটায়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে মানুষের সমাজে পড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। তারা সুস্থ একটি কৈশোর পাচ্ছে না। চোখ তাদের আটকে যাচ্ছে ডিজিটাল স্ক্রিনে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিঃসন্দেহে হুমকিতে। রাজধানীর স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপর এক জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে- তারা দিনের বড় একটি অংশ স্ক্রিনে কাটায়। এতে করে তাদের মধ্যে নানা নেতিবাচক প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

আইসিডিডিআর,বি ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ শিশুর ওপর দুই বছর ধরে গবেষণা চালায়। তাতে দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের স্ক্রিনে চোখ রেখে গড়ে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা কাটায়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মাথাব্যথা, চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ প্রদর্শন করছে শিশুরা। তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বেড়ে যাচ্ছে, খেলাধুলা ও বাইরে বেরুনো এবং সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। বিষণ্নতা উদ্বেগ অস্থিরতা আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে।

আন্তর্জাতিকভবে স্বীকৃতি নিয়ম অনুসরণ করে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে গবেষকরা ঢাকার স্কুলশিশুদের এ মানসিক অবস্থা পেয়েছে। গবেষণার ফল সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রবণতার সাথে মিলে যায়। আমাদের দেশেও অভিভাবকরা শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাবা-মা অধিক হারে ডাক্তারদের কাছে আসছেন। বিষয়টি স্পষ্ট, আমাদের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ইতোমধ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ঘরে ঘরে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।

মূলত এ সময়ে পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে শিশুরা। পাঠ্যপুস্তক শিখনে পিছিয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় ঠিকভাবে স্মৃতিশক্তি কাজ করছে না। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ নানা মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রত্যেকটি বড় শহর এমনকি প্রতিটি গ্রামে একই ধরনের ডিজিটাল আসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকায় ৮০ শতাংশ শিশু প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটানোর পরিসংখ্যান সারা দেশের ক্ষেত্রেও একই রকম হতে পারে। অনিবার্যভাবে বলা যায়, আমরা একটি অসুস্থ উত্তরসূরি নির্মাণ করছি। নিঃসন্দেহে স্ক্রিনে বিপুল সময় দেয়া শিশুরা সঠিকভাবে বিকশিত হবে না। তাদের কর্মশক্তি হবে আশার চেয়ে অনেক কম।

শিশুদের ঘরের বাইরে বিনোদন খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। সমবয়সীরা যাতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারে তার পরিবেশ করে দিতে হবে। শিশুকে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইস দেয়া যেতে পারে। কোনোভাবে তারচেয়ে বেশি নয়। বাকি সময় তারা যাতে এর আওতায় না আসে সেজন্য অভিভাবকদের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এ জন্য অভিভাবকদেরও ডিজিটাল আসক্তি কমাতে হবে। নিজে ঠিক না হলে তার উপদেশ অন্যরা শুনবে না।

শিশুদের রক্ষা করতে হলে এখনই বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য সরকারেরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তার চেয়েও বড় দাগে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। গণমাধ্যমে প্রচার কর্মসূচি নিতে হবে। দেশবাসীকে এ নিয়ে সচেতন করতে হবে। অন্যথায় আমরা একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রজন্ম পাবো ভবিষ্যতে।