দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে পাশবিক করে তুলেছিল শেখ হাসিনা রেজিম। পরে অন্তর্বর্তী সরকার বাহিনীগুলোতে কিছু সংস্কার আনে। পরিবর্তন করা হয় পোশাক; কিন্তু শেখ হাসিনার সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর যারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, তাদের অনেককে কার্যকরভাবে বিচারের আওতায় আনা যায়নি। ওই সময় বেপরোয়া ও বিতর্কিত কাজের কারণে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো আছে।
আশার কথা, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। সংস্কারের কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে র্যাব পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এতে বাহিনীর ক্ষমতা, দায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকবে। দরকার মনে হলে এর নামও বদলে যেতে পারে।
সন্ত্রাস ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। তবে ফ্যাসিবাদের সময়ে র্যাবের গায়ে যে কলঙ্কের দাগ লেগেছে তা কেবল খোলস বদলালে মুছবে না। এর জন্য দরকার ভেতর থেকে সংস্কার।
র্যাব দীর্ঘদিন ধরে অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছ আইনি কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছিল। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকায় এ বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। কিছু কর্মকর্তার হাতে আসে সীমাহীন ক্ষমতা। এর কুফল হিসেবে ঘটে নির্বিচার গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত গুম কমিশনের তথ্য বলছে, গুমের মোট অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশই র্যাবের বিরুদ্ধে। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও নৃশংসতার পেছনে এই বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধ্বংস করা হয়েছিল। কিছু কর্মকর্তার অপকর্মের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না, এটি সত্য।
এখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। শেখ হাসিনার সময় গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব ছিল বিএনপি। তারা এখন সরকারে। ভবিষ্যতে এমন অপরাধের ঘটার পথ বন্ধ করার দায়িত্ব এখন তাদের। এই সরকার কোনো বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে না এটি স্বস্তিকর। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্যও একটি স্থায়ী রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে। আগামী দিনে কোনো সরকারই যেন কোনো বাহিনীকে নিজেদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য স্পষ্ট আইনি সীমা ও আদালতের নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতীতের গুম-খুনের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের পদের তোয়াক্কা না করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর মানবাধিকার রক্ষায় দিতে হবে কঠোর আইনি নিশ্চয়তা।



