হাওরের মাঠে হলুদ স্বপ্ন, গবেষণায় নতুন আশা

হাওর এলাকায় প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে— ‘বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও’। এই প্রবাদের মধ্য দিয়ে হাওরের জীবন ও জীবিকার বাস্তব চিত্র উঠে আসে। বছরের একটা বড় সময় পানিতে তলিয়ে থাকা ওই অঞ্চলে মানুষের চলাচল নৌকানির্ভর। আগে শুকনা মৌসুমে হেঁটেই চলতে হতো। এখন হাওরের কিছু কিছু এলাকায় সড়ক তৈরি হয়েছে। এতে আগের মতো এতটা হেঁটে চলাচল করতে হয় না। কিন্তু এসব উন্নয়ন জলবায়ুতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খরা বেড়েছে। এতে বোরো ধাননির্ভর হাওর জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে বন্দী হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ-বিষয়ক একটি গবেষণা হাওর-কৃষিতে আশার আলো দেখাচ্ছে। হাওরে প্রচলিত প্রধান শস্য হলো বোরো ধান। এই ধান গোলায় তুলতে হয় বর্ষার পানির সাথে প্রতিযোগিতা করে। কখনো কখনো আগাম পানিতে ধান তলিয়ে যায়। কখনো ধান তোলার পর পানি আসে। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর এবং নতুন ধান রোপণের আগে নিচু জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকে। বাকৃবির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই শূন্য সময়টুকুতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা যুক্ত করলে কৃষিবৈচিত্র্য বাড়বে। পাশাপাশি কৃষকের আয় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের সময়টুকুতে সরিষা আবাদ কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প ফসল হতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্মরণ করা প্রয়োজন-হাওরে সরিষা নতুন কোনো ফসল নয়। বহু আগে থেকেই হাওরের কিছু উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে সরিষা চাষ হয়ে আসছে। শীত মৌসুমে হাওরের খোলা মাঠে সরিষা ফুলের হলুদ দৃশ্য মুগ্ধ করার মতো। বাকৃবির এই গবেষণা সেই চর্চার সাথে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সংযোগ ঘটিয়ে হাওর কৃষিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। যা কেবল উৎপাদন নয়, সম্ভাবনার দরজাও বড় করে।

গবেষণায় পাওয়া ফলাফল নিঃসন্দেহে আশা তৈরি করার মতো। স্বল্পমেয়াদি বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৭ জাত নির্দিষ্ট সময়ে বপন ও সঠিক সার ব্যবস্থাপনায় ভালো ফলন দিয়েছে। এর পরবর্তী ফসল হিসেবে বোরো ধানের ফলনও সন্তোষজনক, যা পুরো শস্যচক্রকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তুলেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— বোরো ধান প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই শস্যক্রমে কৃষক অন্তত একটি ফসল নিশ্চিতভাবে ঘরে তুলতে পারছেন।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরে প্রতি বছর একই সময়ে পানি নেমে যায় না। অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিও হয়। তা ছাড়া জমিগুলোর ধরনভেদে উপযোগিতার পার্থক্যও সরিষা চাষের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব বাস্তবতা মাথায় রেখেই গবেষকরা আরো স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত পরিপক্ব জাত উন্নয়ন, কমিউনিটি ফার্মিং চালু, প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং কৃষক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন।

বাকৃবির এই গবেষণা দেখিয়ে দিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় হাওরের পতিত জমিও সম্ভাবনার ভাণ্ডারে পরিণত হতে পারে। এখন প্রয়োজন নীতিনির্ধারক, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ। এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হলে কৃষক এর সুফল পাবে বলে আমরা আশা করি।