রাঙ্গামাটি একটি দুর্গম পাহাড়ি জনপদ। সমতলের মতো যাতায়াতব্যবস্থা স্বাচ্ছন্দ্যময় নয়। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়া কষ্টসাধ্য; কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও চিকিৎসক সঙ্কটে প্রয়োজনীয় সেবা মিলছে না। সেই সাথে জনবল সঙ্কটে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
নয়া দিগন্তে গত রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাঙ্গামাটি জেলায় চিকিৎসকের মোট ২৮১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৫৫ জন। নার্স ও মিডওয়াইফের ৩৮৮টি পদের বিপরীতে আছেন ৩১৪ জন, যেখানে শূন্য পদের হার ১৯ শতাংশ। এ ছাড়া মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ৯৪টি পদের মধ্যে কর্মরত ৭০ জন এবং সেকমো (সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার) পদে ৬৬টির বিপরীতে আছেন ৩৬ জন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ক্ষেত্রে। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এই পদে ২৭১টির বিপরীতে কর্মরত ১৩১ জন। প্রায় অর্ধেক পদ খালি থাকায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও রোগীসেবায় প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়াও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচি, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম মূলত স্বাস্থ্য সহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। অন্য দিকে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বালুখালী, জুরাছড়ির দুমদুম্যা, বাঘাইছড়ির আমতলী এবং বিলাইছড়ির বড়থলী ইউনিয়নে এখনো কোনো স্বাস্থ্য সহকারীর পদ নেই। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা মাতৃস্বাস্থ্য সেবায়। গর্ভবতী মায়েদের সেবায় মিডওয়াইফের ৪২টি পদ থাকলেও পুরো জেলায় কর্মরত আছেন মাত্র দু’জন! নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত ছয়জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কাপ্তাই ছাড়া প্রায় সব উপজেলায় আছে মাত্র তিন-চারজন। এ ছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জামেও আছে তীব্র ঘাটতি। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে তিনটি এক্স-রে মেশিন থাকলেও কাপ্তাই, লংগদু ও রাজস্থলীতে আছে মাত্র একটি করে। কাপ্তাই ও বরকল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো আলট্রাসনোগ্রাফি সেবাই নেই।
পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন সমতলের তুলনায় কঠিন। সে জন্য চাকরিজীবীরা তাদের কর্মস্থল সেখানে হোক, অনেকে চান না। চিকিৎসকরা যেখানে গ্রামাঞ্চলে যেতেই চান না, সেখানে পার্বত্য অঞ্চল তাদের অপছন্দের শীর্ষে থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই বলে রাঙ্গামাটির স্বাস্থ্যসেবা দিনের পর দিন ব্যাহত হবে কেন? এ অবস্থার অবসান অবশ্যই হতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সরকারি চাকরিজীবীদের কেউ অন্যায় করলে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় পার্বত্য জনপদে। বর্তমান শক্তিশালী যোগাযোগের এই যুগে এমন ধারণা অপনোদন হওয়া জরুরি। যেহেতু রাঙ্গামাটি পাহাড়ি জনপদ এবং দৈনন্দিন জীবন তুলনামূলক কঠিন। এটি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে যেসব চিকিৎসককে বদলি করা হবে তাদের প্রণোদনা দেয়া দরকার। জেলাপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে কোনো ধরনের সঙ্কট কিংবা সমস্যা আছে কি না তা তদারকির দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদফতরের; কিন্তু প্রায় প্রতিদিন যে হারে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল দিক উন্মোচিত হচ্ছে, তাতে মনে হয় না, স্বাস্থ্য অধিদফতর এসব সমস্যার সমাধানে মনোযোগী। এটি দুর্ভাগ্যজনক। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। সেই সাথে অনতিবিলম্বে রাঙ্গামাটির সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে জনবল সঙ্কট দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রাঙ্গামাটির স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বিশেষ যত্ন নেবে, এটিই কাম্য।



