ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ইতিহাস গড়ার দায় আজ

জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের মধ্যেই থাকে গণতন্ত্রের শক্তি। সেই অংশগ্রহণের সবচেয়ে কার্যকর প্রকাশ ঘটে ভোটের মাধ্যমে। আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, একই দিনে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিন। এই দিনটি কেবল নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা ও শাসনব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণের সময়।

ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাররা দু’টি বিষয়ে মত প্রকাশ করবেন। প্রথমত, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান জানাবেন। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে পাঠাবেন। এই দুই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার এসে সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ও মতবিনিময় করে। রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্ণ ঐকমত্য না হলেও সরকার জনগণের সামনে হাজির করেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্কারের দলিল, জুলাই সনদ। এটি গণতান্ত্রিক চর্চার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। জনগণের ওপর আস্থা রাখার এই উদ্যোগ ইতিবাচক। এখন দায়িত্ব ভোটারদের। তারা এই সংস্কারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের আলোকে বিচার করে মতামত দেবেন।

জাতীয় সংসদের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে সংসদের কার্যকারিতা, জবাবদিহি ও নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদি সরকারের সময় সংসদ একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সংসদকে কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জনস্বার্থনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব।

ভোটারদের সামনে তাই একটি স্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দলীয় আবেগ বা স্বল্পমেয়াদি প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রার্থীর সততা, যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা ও নীতিগত অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, সংসদ শক্তিশালী হলে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

বহু মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের বড় উপায় হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও সচেতন ভোটাধিকার প্রয়োগ।

আমরা আশা করি, ভোটাররা সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগে সচেতন ও দৃঢ় ভূমিকা রাখবে। গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাদের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী অধ্যায়।

এবারের নির্বাচনকে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হিসেবে আয়োজন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি একে গণতান্ত্রিক যাত্রার ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ঘোষণা শুধু অনুপ্রেরণার বাক্য নয়; এটি সরকারের এক গভীর দায়বদ্ধতারও অঙ্গীকার। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন পরিচালনাকারী সব প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। ভোটারদের দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ, স্বতঃস্ফূর্ত ও নির্ভয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ভোটগ্রহণ নয়, প্রার্থী ও দলের জন্য সমান সুযোগ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ফলাফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলেই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ইতিহাসে স্থান পাবে। জনগণ প্রত্যাশা করে- সরকার কথার মাধ্যমে নয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপে প্রমাণ করবে, এই নির্বাচন হবে ইতিহাসের মাইলফলক।