নতুন নজরদারি প্রযুক্তি

ভয়ের সংস্কৃতি যেন ফিরে না আসে

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের যে দাবি করছে সরকার, এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই। সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- নিরাপদ ইন্টারনেটের নামে যেন একটি ‘নজরদারি রাষ্ট্র’ বা ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি না হয়।

কনটেন্ট ব্লক ও ফিল্টারিং সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশে ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার-এনটিএমসির জন্য প্রায় ৯৫ কোটি টাকার নতুন সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাব অনুমোদন হয়। সিদ্ধান্তটি জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য রক্ষায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আলোকে সহিংসতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরঞ্জামগুলো ব্যবহার হবে। কিন্তু অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং নজরদারির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে জনমনে সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দেয়াটাই স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগ রেজিমে এনটিএমসিকে ব্যবহার করা হয়েছিল ফ্যাসিজমের হাতিয়ার হিসেবে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল। ফোনে আড়িপেতে ভিন্নমত দমন করা হতো। সেই স্মৃতি মানুষের মন থেকে এখনো মুছে যায়নি। ২০২৩ সালে ইসরাইলি প্রযুক্তি কেনা হয়েছিল। সেটি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে এনটিএমসি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এসব প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় নজরদারির এই অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। এমনকি ২০২৫ সালের শেষে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা এই সংস্থা ভেঙে দেয়ার দাবিও তুলেছিলেন।

পরবর্তীতে পুরনো কাঠামো বিলুপ্ত করে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ নামে নতুন কাঠামো গঠন হয়। নজরদারির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রেখে আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। বর্তমান সরকারও দাবি করছে, সংশোধিত আইন অনুযায়ী এখন আড়িপাতা বা নজরদারির ক্ষেত্রে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

প্রযুক্তির এই আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানো যদি শেষ পর্যন্ত ‘কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং’-এর নামে নাগরিকদের স্বাধীন চিন্তা সঙ্কুচিত করা এবং সাংবাদিকতা কিংবা যৌক্তিক সমালোচনা সেন্সরে ব্যবহার হয়, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে অবাধ তথ্যপ্রবাহে বাধা দিলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। দেশে মতপ্রকাশের সুযোগ না থাকলে শাসকের জন্য যে পরিণতি আসে, সেটি আমরা দেখেছি।

আমরা মনে করি, সাইবার অপরাধ দমন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করা নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি নিরাপত্তার অজুহাতে যেন কোনো নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয় সেটা নিশ্চিত করা। অতিসংবেদনশীলতার অজুহাতে সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে ৯৫ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। তার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের যে দাবি করছে সরকার, এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই। সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- নিরাপদ ইন্টারনেটের নামে যেন একটি ‘নজরদারি রাষ্ট্র’ বা ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি না হয়।