প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের কর্মবিরতি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে শিক্ষকদের বেতনভাতা বাড়ানোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পক্ষে আমরা। তবে সেসব বিষয় অবশ্যই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হওয়ার পর থেকে সরকারকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের একধরনের অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে। এতে কখনো সড়ক অবরোধ, কর্মবিরতি, আবার কখনো প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ ঘেরাওয়ের চেষ্টা করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যদিও সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি পেশ করার সুযোগ ছিল; কিন্তু সে পথে না গিয়ে অনেক পক্ষই সরকারকে জিম্মি করার পথ বেছে নিয়েছে। শুরুর দিকে এমন অনেক ঘটনার মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দেশকে অস্থিতিশীল করে রাখার অপচেষ্টা চালিয়েছে; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের সে অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

রোববার থেকে তিন দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তৃতীয় প্রান্তিক শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের মাত্র ৬০-৬৫ শতাংশ পড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অগ্রগতি আরো কম, শুধু ৫০-৫৫ শতাংশ। হাতে রয়েছে মাত্র ২০-২৩টি কর্মদিবস, যা নির্ধারিত সিলেবাস সম্পন্ন করার জন্য অপ্রতুল।

এমতাবস্থায় প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশুনা বন্ধ রেখে শিক্ষকদের কর্মবিরতি কতটুকু যৌক্তিক।

প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত রচিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নানামুখী বাধার সম্মুখীন হয়। পতিত হাসিনা সরকারের সময় দেশে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দু’টি প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো ছাড়া শিক্ষার মানের কোনো উন্নতি হয়নি। নিম্নমানের শিক্ষার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে বাড়তি অর্থ খরচ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে বাধ্য হন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কেন উন্নত হচ্ছে না, গলদ কোথায়, চিহ্নিত করতে হবে।

প্রথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা যে তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন তার মধ্যে রয়েছে- দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি বাস্তবায়ন।

গত ২৪ এপ্রিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১১তম থেকে দশম গ্রেডে এবং ১৩তম গ্রেডে থাকা শিক্ষকদের বেতন ১২তম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আবারো বাড়তি গ্রেডে বেতনভাতার দাবি থাকা অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু সে জন্য এমন কর্মবিরতিসহ রাস্তায় নেমে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত বলতে হয়। তবে গত শনিবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে কাজ চলছে বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আশাব্যঞ্জক।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে শিক্ষকদের বেতনভাতা বাড়ানোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পক্ষে আমরা। তবে সেসব বিষয় অবশ্যই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, সম্মানিত শিক্ষকরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে না দাঁড়িয়ে আলোচনাকে বেশি প্রাধান্য দেবেন। আর সরকারও তাদের দাবি পূরণে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখাবে, সেটিই আমাদের কামনা।