জিয়াউলের বিচারে বিলম্ব, কার্যকর কৌশল নিতে হবে প্রসিকিউশনকে

জনমানুষের প্রত্যাশা, প্রসিকিউশন টিম তাদের কাজের প্রক্রিয়া আরো জোরদার করবে, নিজেদের আইনি কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করবে। কোনো শৈথিল্য না দেখিয়ে এই মামলার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার শেষ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে প্রসিকিউশন টিমের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশিত।

সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে শতাধিক ব্যক্তিকে নৃশংস কায়দায় গুমের অভিযোগ আছে। সাক্ষীদের থেকে পাওয়া কিছু ঘটনা গণমাধ্যমের কাছে বর্ণনা করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। ঘটনাগুলো লোমহর্ষক। তখন আশা করা হয়েছিল, গুম ও খুনের পেছনে যারা দায়ী, তাদের বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে। কিন্তু এই বিচার দীর্ঘ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করছেন, জিয়াউলের বিচার বিলম্বের চেষ্টা চালাচ্ছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তিনি বলেছেন, নানা অজুহাতে তারা সময় চেয়ে, অপ্রাসঙ্গিক আবেদন করে বিচারপ্রক্রিয়া মন্থর করে দেয়ার কৌশল নিচ্ছে।

কোনো মামলার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে উভয় পক্ষের আইনি লড়াই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর গলে বিচার বিলম্বিত হবে কেন? ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমই বা কিভাবে কাজ করছে যে, স্পর্শকাতর মামলার বিচারিক গতি স্বাভাবিক বেগবান হচ্ছে না?

শেখ হাসিনার সময় গুম করা হয় অনেক লোককে। স্বজনদের জন্য দুঃসহ অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে শত শত পরিবারকে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করে ভুক্তভোগীরা। এতদিনে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়ে রায় বা সাজা হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ সাক্ষী জেরা আর সময়ের আবেদনের মারপ্যাঁচে আটকে আছে মামলার অগ্রগতি। আসামিপক্ষ বিলম্বের কৌশল নেবে, এটিই স্বাভাবিক ও আইনি বাস্তবতা। কিন্তু সেই কৌশল রুখে দিয়ে আদালতের সময় সাশ্রয় এবং বিচার নিশ্চিতে দায় রয়েছে প্রসিকিউশন টিমের।

আসামিপক্ষের সম্ভাব্য কালক্ষেপণের কৌশলগুলো আগে থেকে অনুমান করতে পারতে হবে প্রসিকিউশনকে। জেরা ও শুনানির তারিখে যখন একের পর এক অপ্রাসঙ্গিক আবেদন জমা পড়ে তখন ট্রাইব্যুনালের সামনে এসব আবেদনের অপ্রাসঙ্গিকতা বা যুক্তিহীনতার বিষয় জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে তাদের। এসব আবেদন যে স্রেফ কালক্ষেপণের কৌশল তা পরিষ্কার করতে হবে। প্রসিকিউশনের প্রস্তুতি ও আইনি দক্ষতার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

চিফ প্রসিকিউটর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আগামীতে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে আবেদন করা হলে কঠোর আইনি আপত্তি জানানো হবে। প্রশ্ন হলো, এমন কঠোরতা দেখাতে বিলম্ব হলো কেন? ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রসিকিউশন প্রথম থেকেই সক্রিয় হয়নি কেন? গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ববহ মামলায় প্রসিকিউশন টিমের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল নিশ্ছিদ্র, সুপরিকল্পিত এবং গতিশীল।

একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামিপক্ষ অবশ্যই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে। তবে সেই সুযোগ যেন কোনোভাবেই ন্যায়বিচারকে প্রলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায় প্রসিকিউশনের।

জনমানুষের প্রত্যাশা, প্রসিকিউশন টিম তাদের কাজের প্রক্রিয়া আরো জোরদার করবে, নিজেদের আইনি কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করবে। কোনো শৈথিল্য না দেখিয়ে এই মামলার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার শেষ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে প্রসিকিউশন টিমের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশিত।