দেশে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ছে। গত তিন মাসে বেড়ে জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে মাসে ৮.২৯ শতাংশ। এর ফলে সাধারণ মানুষের খাদ্য কেনার ব্যয় বাড়ছে। বাড়ছে ভোগান্তিও। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার অর্থ জনগণের বাড়তি ব্যয়। প্রতিটি পণ্য কেনার পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থনীতির এক নাজুক সময়ে এটি কোনো অপ্রত্যাশিত অবস্থা নয়। ১৫ বছরের লুটপাটের ফলে শূন্য রাজকোষ আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনীতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যেটুকু সাফল্য অর্জন করেছে তা সামান্য নয়।
দেশে মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ রেকর্ড আওয়ামী লীগেরই। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়েছিল আওয়ামী দুঃশাসন ও লুটপাটে। সে বছর মূল্যস্ফীতি উঠেছিল ৬৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল বেশি— ৭৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে— প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে, ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
আমরা জানি, চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের সময় দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে লুটতরাজ বন্ধ করে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন ফেরানোর নানা পদক্ষেপ নিয়ে মূল্যস্ফীতির হার অনেকটা কমাতে সক্ষম হয়। গত বছরের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। আওয়ামী সরকারের সময়ের চেয়ে এটি অনেক কম। ফলে বলাই যায়, নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তিকর পরিবেশ রেখে যাচ্ছে ড. ইউনূসের সরকার। নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য তাই এটি খুব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে না বলেই মনে হয়।
নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গত কয়েক মাস ধরেই অনেকটা স্তিমিত। বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে নির্বাচনে কোন দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয় তার ওপর। দেশী-বিদেশী সবাই সে দিকেই তাকিয়ে আছে। তবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত সরকারের দায়িত্ব থেকে যায় জনগণের জন্য স্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করার, মূল্যস্ফীতি সহনীয় করার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুসারে, গত জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.২৯ শতাংশ। নির্বাচনী ডামাডোলে এটি আরো কিছুটা বাড়তে পারে।
বিবিএসএর তথ্য অনুযায়ী, চাল, ডাল, মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, সবজি ও গোশতসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াই মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ।
মূল্যস্ফীতির এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায়। নগর-মহানগরীর অনিশ্চিত কাজে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের জীবন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। গ্রাম-গঞ্জের স্বল্প আয়ের মানুষ এবং ভাগচাষিদের অবস্থাও তথৈবচ। তাই মূল্যস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
নির্বাচিত সরকার এলে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বোঝা যাবে। নির্বাচনী ইশতেহারে যাই থাকুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের আচরণও অর্থনীতির গতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। দেশব্যাপী বাজার-ঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে কি না সেটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এটি বোঝার জন্য নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।



