মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়া, বিশ্বব্যবস্থায় অশনি সঙ্কেত

ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য নিন্দা ও প্রতিবাদ নেই, যা বিশ্বের জন্য এক অশনি সঙ্কেত।

ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরনের একটি ভয়াবহ আক্রমণ চালানোর সময় আমেরিকা কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বৈশ্বিক নিয়মনীতি ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ তৈরি হয়েছিল, তাতে এ আক্রমণ চপেটাঘাত। এই বিশ্বব্যবস্থা পরাশক্তি আমেরিকার নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল। তারাই নিজেদের তৈরি করা মূল্যবোধ লঙ্ঘন করায় ছোট দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নতুন করে হুমকিতে পড়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ভিত্তিকে এটি বৈধতা দেবে। সেই সাথে চীনের তাইওয়ান একত্রীকরণের দাবি জোরালো করবে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন কাণ্ড ছোট ছোট বহু দেশের সার্বভৌমত্ব ঠুনকো করে দিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়াবে বলে আমাদের ধারণা।

গভীর রাতে রাজধানী কারাকাসে বৃহৎ পরিসরে এক সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার খবর জানা যায়, সোস্যাল মিডিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেয়া পোস্টে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও দেশটির সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায় মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার খবর ও ছবি প্রকাশ করা হলেও ভেনিজুয়েলার পক্ষ থেকে তার বেঁচে থাকার প্রমাণ চাওয়া হয়েছে। মাদুরো সরকারের কর্তাব্যক্তিরা দাবি করেছেন, জঙ্গিবিমান ও হেলিকপ্টার থেকে বেসামিরক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে। বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আন্তর্জাতিক কোনো আইন সমর্থন করে না।

আমেরিকা মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ এনেছে। দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্রে মামলা হয়। তাকে ধরিয়ে দিতে কয়েক দফায় পুরস্কার ঘোষণা দেয়া হয়। একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এভাবে মামলা দায়ের ও ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা দুর্বলের প্রতি সবলের আগ্রাসী আচরণ। শক্তির জোরে সেই প্রেসিডেন্টকে ওয়াশিংটন ধরেও নিয়ে এসেছে। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে বলে এক বিবৃতিতে তার মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন।

মাদুরোকে ধরে আনার পর ট্রাম্প সে দেশটির সরকার পরিচালনার দাবি করেছেন। সেই সাথে ঘোষণা করেছেন, তার দেশের বড় তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলায় এখন থেকে কার্যক্রম শুরু করবে। সেখানে মোটাদাগে বিনিয়োগ করে তেলখনিগুলো লাভজনক করবে, যা ভেনিজুয়েলার জনগণের জন্য উপকারে আসবে। বাস্তবে মাদুরোর আগের প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ শুরু হয় খনিজসম্পদ জাতীয়করণ নিয়ে। মাদুরোও শ্যাভেজের নীতি অনুসরণ করায় আগের সরকারের মতো তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের রোষানলে পড়েন। অর্থনৈতিক বিরোধ যে মাদুরোর ওপর হামলার মূল কারণ তা সহজে অনুমেয়। ভয়ের দিকটি হচ্ছে, এটি বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোকে বেপরোয়া করে তুলতে উৎসাহিত করবে।

এই হামলার পর ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিবাদ গভীর হবে। বিবদমান পক্ষগুলোার মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধার আভাস দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বাধলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলবে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার তীব্র অভিঘাত বৈশ্বিক বিপর্যয়ের চিহ্ন হয়ে এখনো দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য নিন্দা ও প্রতিবাদ নেই, যা বিশ্বের জন্য এক অশনি সঙ্কেত।