বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল, একজন রাষ্ট্রনায়কের বিদায়

জনগণের প্রতি খালেদা জিয়ার উচ্চ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এতে প্রমাণিত হয়। তার মৃত্যুতে জাতি এক অপূরণীয় শূন্যতা অনুভব করছে। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।

বেগম খালেদা জিয়া দুনিয়াবি সফর শেষে আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। তার ইন্তেকালে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ হলো। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী; মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয়। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন সাধারণ গৃহবধূ হয়েও আত্মবিশ্বাসের জোরে অসাধারণ হয়ে ওঠা যায়। জন্ম থেকে রাজনীতির দীর্ঘ প্রেক্ষাপট থাকলেই কেবল প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়, এ ধারণা ভুল প্রমাণ করে নিজের প্রজ্ঞা আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে তিন তিনবার হয়েছেন সরকারপ্রধান। সুবিধাবাদিতা ও রঙ বদলের পঙ্কিল মাঠে তিনি নিখাদ দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে পুরো জাতির সাথে নয়া দিগন্ত পরিবারও গভীরভাবে শোকে মুহ্যমান।

৮০ বছরের দীর্ঘ জীবনে প্রথম ভাগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে সাদামাটা জীবন, পরবর্তীতে স্বামীর মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্ভরযোগ্য জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভাব। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানো আর দেশের স্বার্থে আপসহীন থাকার দুর্লভ গুণ রাজনীতিতে তাকে স্থায়ী করে রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়াকে জাতি প্রথম প্রত্যক্ষ করে। প্রতারণা ধোঁকাবাজি ও বিভক্তির নীতি দিয়ে এরশাদ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেন। তবে খালেদা জিয়ার আপসহীন মনোভাব এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করে।

আন্দোলন চলাকালে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একমাত্র খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে রাজি করাতে পারেননি এরশাদ। প্রলোভন ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনো কিছুতে কাবু হননি খালেদা জিয়া। সেসময় থেকে তিনি আপসহীন নেত্রীর খ্যাতি পান। এর পর থেকে বাংলাদেশের পথচলায় খালেদা জিয়া সবচেয়ে কার্যকর ও প্রধান নেতা হিসেবে সামনে থেকে লড়াই করেছেন।

বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার রাজনীতি ১৯৯১ সালে তার হাত ধরে পুনঃপ্রবর্তিত হয়। বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ, নানা ধরনের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে দেশের গণতন্ত্র বিকাশে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। আধিপত্যবাদের নানামুখী আক্রমণে দেশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এ যাত্রায় খালেদা জিয়া দেশের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণও তাকে আপন করে নিয়েছেন। তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ তা বোঝা যায়, সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ পাঁচ আসনে প্রার্থী হয়ে কোনোবার পরাজিত না হওয়া। অন্য কোনো নেতাকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জনপ্রিয়তায় তার ধারে কাছে দেখা যায়নি।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত হন খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অপবাদ রটানো হয়। এতিমের টাকা মেরে দেয়ার মিথ্যা অভিযোগে জেলে পোরা হয়। শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে অন্যায়ভাবে উৎখাত করা হয়। খোদ শেখ হাসিনা তাকে নিয়ে কদর্য ভাষায় বারবার আক্রমণ করেছেন। শিষ্টাচারবহির্ভূত এসব বাক্যবাণের কোনো জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি খালেদা জিয়া। নীরবতার মধ্যদিয়ে পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তিনি। তার পরিবারও ভয়াবহ নিগ্রহের শিকার হয়েছে। সীমাহীন অত্যাচারে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মায়ের বহু আগেই প্রাণ হারান। বড় ছেলে তারেক রহমানকে নির্মম অত্যাচার করে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেয়া হয়। এরপরও নীতিতে অটল ছিলেন তিনি। একজন জাতীয় নেতার যে মানদণ্ড খালেদা জিয়া স্থাপন করে গেছেন; তা স্পর্শ করা যে কারো জন্য সত্যিই কষ্টসাধ্য।

খালেদা জিয়ার সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে, এক দিনের সাধারণ ছুটি দিয়েছে। দেশের সব রাজনৈতিক নেতা, শ্রেণিপেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন। বিশ্ব নেতারাও শোক জানিয়েছেন। এ অঞ্চলের কোনো নেতার মৃত্যুতে এই মাত্রার শোক খুব কমই দেখা গেছে। জনগণের প্রতি খালেদা জিয়ার উচ্চ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এতে প্রমাণিত হয়। তার মৃত্যুতে জাতি এক অপূরণীয় শূন্যতা অনুভব করছে। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।