বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। সাড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্পের কাজ আগামী মার্চে শুরু হতে পারে। আপাতত নিজস্ব অর্থায়নে তিনটি পর্যায়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন হবে। আগ্রহী উন্নয়ন সহযোগী পাওয়া গেলে পরে ঋণ নেয়া হতে পারে।
ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারত গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ১৯৭৫ সাল থেকে। এতে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই ক্ষতি প্রশমনের পদ্মা ব্যারাজ অত্যন্ত জরুরি।
ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়লে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। নদীতে নাব্য হ্রাস ও পলি জমার সমস্যা কমতে পারে। সাত-আটটি নদীতে পানি সরবরাহ করা যাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেচসুবিধা বাড়বে। তাই বিশেষজ্ঞরা সবসময় এই ব্যারাজ নির্মাণে গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভারত যখন থেকে ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্প শুরু করে তখন সেই ষাটের দশকে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। এরপর বিভিন্ন সময়ে অন্তত চারবার প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাধীনতাযুদ্ধ– ইত্যাদি কারণে পাকিস্তান আমলে এটি আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। স্বাধীনতার পরও এ প্রকল্প নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। ২০০২ সালে কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশলগত নকশা প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলতে থাকে। ২০১৬ সালে একটি যৌথ কারিগরি উপকমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। ভারতের সবুজ সঙ্কেত না পাওয়া এর একমাত্র কারণ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণকে সান্ত্বনা দেয়ার উপায় হিসেবে বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের পানি বিশেষজ্ঞদেরও কেউ কেউ সরকারের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। মূলত রাজনৈতিক কারণে প্রকল্পটি ৬০-৭০ বছরে আলোর মুখ দেখেনি।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি সামনে এনেছে তাদের মেয়াদের একেবারে শেষপর্যায়ে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে তাদের সরে যেতে হবে। এ সময় এত বড় প্রকল্প সামনে আনায় সেই একই জল্পনা নতুন করে দেখা দিতে পারে যে, এটিকে রাজনৈতিক কারণে সামনে আনা হয়েছে কি না। যেমনটি এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। একটি জাতীয় দৈনিককে তিনি বলেছেন, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকে যাবে। কারণ ভারতের সাথে সমঝোতা ছাড়া পানিপ্রবাহ পাবে না বাংলাদেশ। পানি না পেলে ব্যারাজ কোনো কাজে দেবে না।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতি ভারত যে তীব্র বৈরী আচরণ করছে, তাতে স্বাভাবিক আলোচনা চালিয়ে নেয়া খুব কঠিন একটি কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের এটি বাঁচা-মরার প্রশ্ন। প্রয়োজনে এটিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে নিয়ে যেতে হবে। তবু গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণেরও দায়িত্ব আছে। এমন দলকে নির্বাচিত করতে হবে–যারা আওয়ামী লীগের মতো ভারতের তাঁবেদার হবে না।



