যুদ্ধবিরতিতেও গাজায় হত্যার উন্মাদনা, বিশ্ব নেতৃত্বের নীরবতা ভাঙতে হবে

যুদ্ধবিরতি শব্দটি সাধারণত স্বস্তি, নিরাপত্তা ও মানবিক অবকাশের বার্তা দেয়; কিন্তু গাজার ক্ষেত্রে তা নিষ্ঠুর পরিহাসে রূপ নিয়েছে। গত বছর ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর পরও গাজায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল।

গত বুধবার ভোর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই শিশু ও তিনজন সাংবাদিক ছিলেন। মধ্য গাজার নেতজারিম করিডোরের কাছে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। গাড়িটি একটি ত্রাণ-সংস্থার সাথে যুক্ত ছিল। গাড়ির ভেতরে সাংবাদিক আছেন সে তথ্য ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অজানা ছিল, এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিক হত্যায় এ অজুহাত ইসরাইলের নতুন কিছু নয়; বরং পুরনো কৌশল।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব- যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৬৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ- যুদ্ধ থামার কথা থাকলেও মৃত্যু থামেনি; বরং যুদ্ধবিরতির আড়ালে তা আরো ‘স্বাভাবিক’ করে তোলা হয়েছে। এসব হত্যা এমন একসময় ঘটছে, যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোযোগ ভেনিজুয়েলা, ইরানসহ অন্য দিকে। এতে গাজা অনেকটা আলোচনার বাইরে চলে গেছে। এ সুযোগে নৃশংসতা চালাচ্ছে ইসরাইল। দীর্ঘ দিন ধরে অবরুদ্ধ ও নির্যাতিত গাজাবাসীর প্রাণের মূল্য যে আন্তর্জাতিক পরিসরে খুব কম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের পাশাপাশি গাজায় খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়-সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরাইল। এতে ২২ লাখ মানুষ চরম মানবিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছেন। জ্বালানি কাঠ কুড়াতে গেলেও শিশুরা হত্যার শিকার হচ্ছে। সাংবাদিকদের হত্যা করা হচ্ছে সত্য তুলে ধরার অপরাধে। গাজার এসব হত্যা সংবাদ বহু আগেই ‘স্বাভাবিক খবরে’ পরিণত হয়েছে; এটি ভয়ঙ্কর।

এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল মিডিয়াকে নিহতের সংখ্যা নয়; বরং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীতিগত দায়, যুদ্ধাপরাধ ও ইসরাইলকে দেয়া দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে হবে। সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জোরালোভাবে তুলতে হবে। এ নিয়ে জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক মহলের দায়িত্ব কেবল ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ বা বিবৃতি দেয়া নয়। মানবতার পক্ষে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে স্বাধীন ও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ত্রাণ প্রবেশে বাধা প্রত্যাহারে চাপ দিতে হবে। সাংবাদিক ও বেসামরিক নাগরিক হত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

ইসরাইল ও তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়া প্রয়োজন। যুদ্ধবিরতি মানে কেবল অস্ত্র নামানো নয়; এর অর্থ মানবিকতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান জানানো। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই শান্তি চায়, তবে একতরফা পক্ষপাত ছেড়ে ইসরাইলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে ওয়াশিংটন।

গাজা এখন কেবল একটি জনপদের নাম নয়; এটি আন্তর্জাতিক বিবেকের পরীক্ষা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হওয়া মানে ভবিষ্যতে আরো গাজার জন্ম দেয়া। যুদ্ধবিরতির আড়ালে চলা এই নীরব হত্যার উন্মাদনা বন্ধ না হলে একদিন সবাইকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।