বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিতি, ঢাকার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে

বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তার নামাজে জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ দেয়, তিনি মানুষের হৃদয়ের গহিনে কিভাবে জায়গা করে নিয়েছেন। এর মূল কারণ, বেগম জিয়া নীতিতে দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়েছেন। দেশের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করেননি। ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে হিমালয়সম ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করে দেশে থেকেছেন। তার মৃত্যু-পরবর্তী দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়ায় বেগম জিয়ার সম্মানজনক উচ্চ অবস্থানের ইঙ্গিতবাহী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তা উঠে এসেছে।

খালেদা জিয়া তার শাসনামলে সবসময় চেয়েছেন ঢাকা আত্মমর্যাদার সাথে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করুক। তাই দেখা যায়, তার শাসনামলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশকে সব দেশ সমীহের চোখে দেখেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় ঢাকা দীর্ঘ দেড় দশক প্রতিবেশী ভারতের প্রভাববলয়ে থাকায় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ছিল ম্রিয়মাণ। পতিত স্বৈরাচারের আমলে ঢাকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল অনুপস্থিত। প্রকৃত বাস্তবতায় তখন মূলত দিল্লির প্রেসক্রিপশনে চলেছে বাংলাদেশ।

চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর আবার ঢাকা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক ভাবমর্যাদাও প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাস সময়ে ঢাকা যে পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীনভাবে চলার নীতি নিয়েছে, তার বড় প্রমাণ- ভারতে হিন্দুত্ববাদী সরকারের মদদে সে দেশের সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাকার অসন্তোষ জানিয়ে মজলুমদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়া।

ঢাকা যে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়েছে, তার আরেকটি নমুনা আমরা দেখতে পাই- বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে ঢাকায় এশিয়ার সাত দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানো। খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন ৩২ কূটনীতিক। উপস্থিত হন দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয় ও পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার।

রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকায় বেগম জিয়া সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে পড়েন না। তার জানাজায় দেশের বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ ও বিদেশীদের সর্বোচ্চ শোক জানানোর ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রমাণ হয়, নেতা হিসেবে তার মর্যাদা কত উচ্চপর্যায়ে। যা বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার বিদ্বেষ-ঘৃণা দিয়ে ঢেকে দিতে চেয়েছে। ঢাকা তার পররাষ্ট্র্রনীতিতে স্বকীয়তা বজায় রাখার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, বেগম জিয়ার উচ্চ ভাবমর্যাদায় তা আরো সহজ করে দিচ্ছে। এখন ঢাকায় কোনো শক্তিশালী দেশের প্রভাব কাজ করছে না; বিশেষ করে ভারতের। দিল্লি বাংলাদেশ বিষয়ে নমনীয় হয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

বেগম জিয়ার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অনমনীয়তা সেই সূত্রে যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, এটিই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এখন তির্যকভাবে কাজে লাগছে। তার জানাজার আনুষ্ঠানিকতাও দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে জোরালো ভূমিকা রাখবে। বেগম জিয়ার ইন্তেকালে তার অনুপস্থিতিও একটি শক্তি হিসেবে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে আধিপত্যবাদবিরোধী বাঁকবদলে ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘিরে জাতীয় জীবনে যে ইতিবাচক অভিঘাত দেখা যাচ্ছে, তাতে সামনের দিনগুলোতে স্বাতন্ত্র্য বজায়ে রেখে ঢাকার পথচলা আরো দৃঢ় হবে- এটি সহজে অনুমেয়।