নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপানো

জড়িতদের কোনো ছাড় নয়

বিনামূল্যে বিতরণের জন্য পাঠ্যবই দরপত্র নির্ধারিত মূল্যমানের কাগজে ছাপানোর সমস্যাটির সমাধান করতে হলে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। বরাবরই সরকার সেটি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। যারা এই জালিয়াতি করছে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা ও শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এই জালিয়াতির অবসান হবে আশা করা যায়।

২০২৬ সালের নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের ৩০ কোটির বেশি বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করবে সরকার। এসব পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছে ১০৪টি বেসরকারি ছাপাখানা (মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান); যার মধ্যে শুরু থেকে কয়েকটি ছাপাখানার বিরুদ্ধে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই নিম্নমানের কাগজে ছাপানোর গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৫-এর মতো ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও পাঠ্যবই নিম্নমানের কাগজে ছাপিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কয়েকটি ছাপাখানার মালিক। স্মরণযোগ যে, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ৩৩ শতাংশ বই নিম্নমানের ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

নয়া দিগন্তের খবর, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট বইয়ের ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের কাজ পেয়েছে একই পরিবারের মালিকানাধীন নোয়াখালীতে অবস্থিত কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস এবং কেরানীগঞ্জে অবস্থিত আনোয়ার প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিকেশন ও কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন। এর মধ্যে প্রথম দু’টির মালিক সহোদর দুই ভাই। অন্য দু’টির একজন তাদের ভগ্নিপতি ও ভাগ্নে। এর মধ্যে কর্ণফুলী ও অগ্রণী নামের দু’টি ছাপাখানা থেকে ছাপানো ৫০ লাখ ফর্মা যা নিম্নমানের রিসাইকেল করা কাগজ দিয়ে ছাপানো হয়। তদারককারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি এগুলোর বাঁধাই, কাটিং ও সরবরাহ স্থগিত করেছে। শুধু তা-ই নয়, ছাপা হওয়া নিম্নমানের এসব বই ও ফর্মা ধ্বংসের নির্দেশও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণীর বিষয়ভিত্তিক একাধিক লটের বিপুলসংখ্যক বই মুদ্রণের কাজ পাওয়া কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস পাঠ্যবই ছাপাতে সাড়ে আট হাজার টন কাগজ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার টন কাগজ ইতোমধ্যে ব্যবহার করে পাঠ্যবই ছাপিয়েছে। তবে পাঠ্যবই ছাপাতে ছাপাখানা দু’টি ৬০-৭০ শতাংশ নিম্নমানের (তিন হাজার ৮৫০ টন) কাগজ ব্যবহার করেছে। যেখানে ভালো মানের এক টন কাগজের দাম বাজারে এক লাখ ১৫ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। সেখানে প্রেস দু’টি নিম্নমানের রিসাইকেল কাগজ ব্যবহার করছে; যার বাজারদর ৬৫-৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ টনপ্রতি পার্থক্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এতে সরকারের ২০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছেন অভিযুক্ত এসব প্রেস মালিকরা।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে নিম্নমানের কাগজে বিনামূল্যের সরকারি পাঠ্যবই ছাপানো ছিল একটি বড় সমস্যা। এনসিটিবির মতো সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে তখন। কিন্তু দুঃখজনক হলো- ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পরও পাঠ্যপুস্তক ছাপানোতে দুর্নীতি এখনো বন্ধ করা যায়নি। এই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত ত্রিমুখী দুষ্টচক্র, যার মধ্যে রয়েছেন এনসিটিবির একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা, কিছু প্রেস মালিক এবং রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত একশ্রেণীর লোক।

নিম্নমানের পাঠ্যবই শিক্ষাবর্ষের মধ্য সময়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারে না, যা শিক্ষার সামগ্রিক মান কমিয়ে দিচ্ছে।

বিনামূল্যে বিতরণের জন্য পাঠ্যবই দরপত্র নির্ধারিত মূল্যমানের কাগজে ছাপানোর সমস্যাটির সমাধান করতে হলে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। বরাবরই সরকার সেটি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। যারা এই জালিয়াতি করছে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা ও শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এই জালিয়াতির অবসান হবে আশা করা যায়।