বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরভাতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

বাংলাদেশে শিক্ষাকে অনেকটাই ব্যবসায়িক পণ্য বানানো হয়েছে। গুণগত শিক্ষাদানের চেয়ে এখানে বেশি প্রাধান্য পায় লাভক্ষতির হিসাব। বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে শিক্ষা শুধু বাণিজ্য থাকেনি; এটিকে একটা শ্রেণী ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে ফেলেছিল। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ততার দোহাই দিয়ে তারা অবৈধভাবে অর্থ কামিয়ে নেয়ার পথ করে নিয়েছিল। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা মেরে দিয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে। বছরের পর বছর এ ধরনের অন্যায় সংঘটিত হলেও দেখার কেউ ছিল না। সারা দেশে যেভাবে অবাধে ফ্যাসিবাদীরা অনিয়ম করার লাইসেন্স পেয়েছিল, এখানেও তারা সেই লাইসেন্স ব্যবহার করেছে।

চক্রটি শিক্ষকদের সঞ্চয়ের টাকা জমা রেখেছে বেসরকারি ব্যাংকে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠিত সরকারি ব্যাংকে তা রাখার কথা। এমনকি তারা বেছে নেয় বেসরকারি দুর্বল ব্যাংক, যেসব ব্যাংক বড় আস্থার সঙ্কটে ভুগছে। কেবল অধিক মুনাফা বের করে নেয়ার জন্য এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এই বাড়তি মুনাফা কায়দা করে ভোগ করেছে চক্রের অসৎ লোকরা। কিন্তু শিক্ষকরা সময়মতো অবসরভাতা পাননি। নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, অবসরে যাওয়া শিক্ষকরা এখন তাদের পাওনা টাকা তুলতে পারছেন না। বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থতায় পড়েও তাদের অবসরভাতা মিলছে না। অনেকে টাকা না পেয়ে মৃত্যুবরণও করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। তাতে অনিয়মের সাথে সুবিধাভোগী কর্মকর্তার সম্পৃক্ত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, ভুয়া ইনডেক্স তৈরি করা হয়, আবার একই ইনডেক্সের বিপরীতে একাধিকবার অবসরভাতা সুবিধা দেয়া হয়। অথচ ন্যায্য দাবিদাররা তাদের অংশ পাননি।

শিক্ষকদের অবসরভাতা ও কল্যাণ ফান্ড নয়ছয় হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিক্ষক ও সরকারের বিভিন্ন পক্ষ থেকে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য দু’টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এতে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডর একজন কর্মকর্তা যিনি এ বিভাগ কর্তৃক মনোনীত হবেন। অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকানোর জন্য চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অফিস নতুন ঠিকানায় নেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারেরর সময়ে নেয়া এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। অবসরে যাওয়া একজন শিক্ষকও যেন তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হন সে দিকে কড়া নজর রাখতে হবে।

আমাদের দেশে দুর্নীতি-অনিয়ম লাগামছাড়া হওয়ার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বড় ভূমিকা আছে। শিক্ষকদের অবসরভাতা ঠিকঠাক ফিরে পেতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যারা এই জঘন্য দুর্নীতির সাথে জড়িত, সেই চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অথচ চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। শাস্তি না পেলে আশঙ্কা রয়েছে, এই অসাধু ব্যক্তিরা আবারো দুর্নীতি-অনিয়মের নতুন রাস্তা বের করে নেবে। উৎসাহিত হবে অন্য দুর্নীতিবাজরাও।