দীর্ঘ বিরতির পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়ে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন নির্দিষ্ট সময়ের কিছু দিন আগেই তার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা প্রায় ১০৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। সর্বনিম্ন ধাপে বেতন কাঠামো আট হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ধাপে বেতন কাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। কমিশনের এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার দরকার পড়বে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বেতনভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ-সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে, যা নিঃসন্দেহে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সাহায্য করবে। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ৮:১ সুপারিশ করা হয়েছে, যা বেতনবৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে। বর্ধিত বেতন সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলবে। তবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে, যা সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়াবে। অতিরিক্ত অর্থ বাজারে এলে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা অতীতে দেখা গেছে। এতে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এটি আংশিকভাবে এবং জুলাই ২০২৬ থেকে পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এ সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে না; একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। তবু সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা ও অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
মূলত, বেতন কমিশন বাস্তবায়ন এক দিকে যেমন সরকারি কর্মীদের জন্য স্বস্তির কারণ হবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, যা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করার দরকার আছে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু কর্মচারীদের বেতনভাতা বাড়ার সাথে সাথে সরকারি সেবার মান বাড়বে কি না, অর্থাৎ- দেশবাসী আরো উন্নত ও সুষ্ঠুভাবে সরকারি পরিষেবা পাবেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে সরকারকে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিতে হবে। সেই সাথে নিজস্ব জনবলের জবাবদিহি নিশ্চিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরকারি কর্মচারীদের সমুদয় ব্যয়ভার বহন করা হয়, যার সরবরাহ আসে জনগণের করের টাকায়।



