বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার নতুন সমস্যা নয়; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে পাচারকারীদের কৌশল পরিবর্তনে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কঠোর অভিযানের পরও মাদক চোরাচালান ঠেকানো যাচ্ছে না। মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরের সাগরপথ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও আইস দেশে প্রবেশ করছে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন মতে, এই তিনটি পথে দেশে ৯০ শতাংশ মাদক আসছে। একই সাথে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক বাংলাদেশে ঢুকছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২৯টি সীমান্ত জেলার ১৬২টির বেশি রুট এখন মাদক পাচারে ব্যবহার হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পাচারকারীরা রুট না বদলালেও কৌশল বদলেছে। কখনো ফল, চাল, সারের বস্তা কিংবা মসলা পণ্যে মাদক লুকিয়ে আনা হচ্ছে। কখনো ট্রলার বা পশুবাহী ট্রাকে বহন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে জঙ্গল বা জলাশয়ে মাদক ফেলে রেখে যাচ্ছে, পরে সময়-সুযোগমতো তা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আরেকটি দিক হলো, মাদকের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। অত্যন্ত ক্ষতিকর এই মাদক তরুণসমাজকে দ্রুত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য, দেশে প্রতি বছর শতকোটি টাকার আইস ঢুকছে। এর একটি বড় অংশ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও বিপুল পরিমাণ মাদক ছড়িয়ে পড়ছে।
এই সমস্যার পেছনে শুধু পাচারকারীদের কৌশল নয়, সামাজিক বাস্তবতাও দায়ী। হতাশা, মানসিক চাপ, সামাজিক অবক্ষয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিচ্ছিন্ন জীবন তরুণদের একাংশকে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চাহিদা থাকলে সরবরাহের পথ তৈরি হবে। এ বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই। ফলে মাদক প্রতিরোধে কেবল সীমান্ত পাহারা দেয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক ও মানসিক প্রতিরোধ।
সীমান্ত এলাকায় যারা বসবাস করেন, তাদের অনেকে মাদক বহনকে কোনো অপরাধ মনে করেন না। অনেকে এটিকে জীবিকার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থনৈতিক সঙ্কট ও বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব তাদের এ চক্রে যুক্ত করছে। সীমান্ত অঞ্চলে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সচেতনতা না বাড়ালে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
ভারতের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। ফেনসিডিল-সহ নানা ধরনের মাদক ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে আরো কঠোর অবস্থান নেয়া। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত টহল, তথ্য আদান-প্রদান এবং সন্দেহভাজন পাচার রুটগুলোতে যৌথ নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সাথে যেসব সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বারবার মাদক ঢুকছে, সেগুলোতে আধুনিক নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদক একটি নীরব মহামারী। এটি শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। তাই তরুণ সমাজকে ইতিবাচক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হতে পারে এ ভয়াবহ সমস্যার কার্যকর সমাধান।


