প্রবাসে কম বয়সে শ্রমিকদের মৃত্যু

সরকারের সহায়তা মিলে না

অন্তর্বর্তী সরকার প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষায় বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করব, মৃত শ্রমিকদের ব্যাপারেও তারা প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবে।

প্রবাসে যাওয়া শ্রমিকদের নিরাপত্তার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সুস্থ সবল অবস্থায় বিদেশে যাওয়া তরুণদের একটি অংশ মারা যাচ্ছে। গড়ে ৩৭ বছর বয়সে প্রবাসে তারা মৃত্যুবরণ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্বাভাবিক মৃত্যুসনদ দেয়া হলেও তা নিয়ে দেখা দিচ্ছে সন্দেহ। এদিকে সরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট সতর্কতা না থাকায় আত্মীয়স্বজনদের তা মেনে নিতে হচ্ছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ ও অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু যৌথভাবে প্রবাসীদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে কাজ করে। এদের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংলাপে প্রবাসে কর্মীর অধিক হারে মৃত্যু নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। গত ১২ বছরে প্রবাসে ৪০ হাজার ৭১৩ কর্মীর মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে চার হাজার ৮১৩ প্রবাসীর লাশ দেশে এসেছে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীর ৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা, ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা। ২৮ শতাংশের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বাকিরা প্রবাসে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বাভাবিক মৃত্যুর যে সনদ পাওয়া যায় তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা সন্তুষ্ট নন। দেখা যায়, তাদের দেহে আঘাত কিংবা নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়। ওইসব পরিবার প্রিয়জনদের মৃত্যুর কারণ জানতে চায়। এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে একটি বিহিত আশা করেন তারা।

প্রবাসে পাঠানোর আগে শ্রমিকদের দেশে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। সুস্থ নিরোগ ব্যক্তিদের বিদেশে পাঠানো হয়। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তারা নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদিকে প্রবাসী কর্তৃপক্ষ মৃতের সাথে একটি সনদ দেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটি যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। জরিপ করে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ পরিবার লাশের সাথে থাকা সনদ বিশ্বাস করে না।

প্রবাসে বাংলাদেশী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে কম আলোচনা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা প্রবাসে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করেন। আট ঘণ্টার জায়গায় ১৬-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করেন। এতে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেশির ভাগ শ্রমিক দেশে ধারদেনা করে যান। তারা বাড়তি কষ্ট করে সেই টাকা উঠাতে চেষ্টা করেন। আবার দেখা যায়, সামর্থ্যরে বাইরে পরিশ্রম করার পরও উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না। ফলে হতাশায় ভুগেন। এদিকে নারীশ্রমিকদের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। অনেকে তা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন।

প্রবাসে মারা যাওয়া শ্রমিকদের লাশ দেশে ময়নাতদন্ত করতে হবে। এতে করে স্বাভাবিক মৃত্যুসনদ পাওয়াদের কেউ যদি নির্যাতন কিংবা অন্য কারণে মারা যায় তার প্রতিকার মিলতে পারে। এতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পাশাপাশি বিচার পাওয়ার অধিকারও আদায় করা যাবে। শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেশে দিতে হবে। যেখানে তারা প্রবাসের প্রতিকূল পরিবেশ নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পাবে। বিশেষ করে রোগব্যাধি নিয়ে তারা সতর্ক হতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকার প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষায় বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করব, মৃত শ্রমিকদের ব্যাপারেও তারা প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবে।