প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত এবারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। যদিও নির্বাচন ঘিরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ কতটুকু বজায় থাকবে তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সক্ষমতার ওপর। কারণ এবারের নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দিনই বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইতোমধ্যে অনেক আসনে নির্বাচনী ক্যাম্প, মাইক, অফিস, গাড়ি, ভোটকেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। হামলা-সংঘর্ষে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
যদিও সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছে। আসন্ন নির্বাচনে এক লাখ সেনাসদস্যসহ মোট আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। তবু নির্বাচন ঘিরে সঙ্ঘাত-সহিংসতার শঙ্কা কাটছে না।
আমাদের স্মরণে থাকার কথা, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সঙ্গত কারণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রচার ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের শঙ্কা, সামনের দিনগুলোতে সহিংসতার মাত্রা বাড়তে পারে। সঙ্ঘাত-সংঘর্ষে ব্যবহার হতে পারে অবৈধ অস্ত্র। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত রয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে দেড় লাখের বেশি পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে। ইতোমধ্যে ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছেন পুলিশসহ অন্য বাহিনীর সদস্যরা।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠ পুলিশকে কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। নির্বাচনী নিরাপত্তার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
নির্বাচনী নিরাপত্তার বিষয়ে আইজিপি ড. বাহারুল আলম জানিয়েছেন, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রস্তুতিতে আমাদের কোনো ঘাটতি নেই। কেউ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে গ্রেফতার করা হবে। কেউ যেন অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ তৎপর আছে।
ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে দেশের মানুষ আনন্দ-উৎসবমুখর একটি নির্বাচন চায় এবার; কিন্তু নির্বাচন ঘিরে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে নিশানা করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা যে ফ্যাসিবাদের দোসররা করতে চায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। নিয়মের বাইরে কেউ কিছু করলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সবার সাথে সমান আচরণ করতে হবে। প্রার্থীদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে হলে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সবার পেশাদারি মনোভাব বজায় রাখতে হবে।



