সাধারণ মানুষের অর্থ সঞ্চয়ের সব খাতই এখন বিপর্যস্ত অথবা অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে ঢেকে গেছে। সরকারি, বেসরকারি ব্যাংক থেকে শুরু করে লিজিং কোম্পানি, শেয়ারবাজার, বীমা ও সমবায়- সব খাতেরই একই অবস্থা। কোথাও অর্থবিনিয়োগ বা সঞ্চয় করে নিশ্চিত থাকার উপায় নেই। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে হাজারও মানুষ পথে বসেছেন। ব্যাংকে আমানত রেখে মুনাফা পাওয়ার বদলে অর্থ খুইয়েছেন। বীমা কোম্পানিতে মাসের পর মাস প্রিমিয়াম জমা দিয়ে সঞ্চিত অর্থ ফেরত পান না বেশির ভাগ মানুষ। এ এক মহা নৈরাজ্যের চিত্র।
গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে ‘সঞ্চয়ের সব খাত আস্থার সঙ্কটে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট খাতের চিত্র সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। এতে ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, শেয়ারবাজার, বীমা ও সমবায় ইত্যাদি প্রতিটি খাতে বিদ্যমান যে বাস্তবতা উঠে এসেছে তা এক কথায় নৈরাশ্যজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশির ভাগ ব্যাংকে টাকা রাখলে ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বড় কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া সবই ঝুঁকিতে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লাইফ সাপোর্টে। শেয়ারবাজারে মূলধন হারানোর ভয়, বীমা কোম্পানিতে সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাওয়া যায় না। সমবায়ে আছে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ। মূলত নির্বিচার লুটপাট ও দুঃশাসন একটি জাতির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কিভাবে মিসমার করতে পারে এটি হয়তো তারই তত্ত্বগত উদাহরণ। পতিত হাসিনা সরকার এই দৃষ্টান্তই রেখে গেছে। তাদের দীর্ঘ অপশাসন, লুটপাট ও ব্যাপক জালজালিয়াতির কারণে ব্যাংক খাতে ধস নামে। কোনো কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগসাজশেরও অভিযোগ আছে। বছরের পর বছর ধরে এসব চলতে থাকায় সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুরোপুরি ধসে গেছে।
অপশাসনের অবসানের পর এখন সময় এসেছে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ; কিন্তু এটি সহজসাধ্য নয়।
বিএনপির নতুন সরকার এরই মধ্যে আর্থিক খাতে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা কারো মনেই আশার সঞ্চার করেনি; বরং ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। একজন অর্থনীতিবিদ সংশ্লিষ্ট দৈনিককে বলেছেন, আর্থিক খাতে সুশাসনের চর্চা না হলে সমস্যা আরো বাড়বে; কিন্তু সে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরকে অপসারণের উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে পদ্ধতিতে গভর্নরকে সরানো হয়েছে তা ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা আরো নষ্ট করেছে।
নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে পতিত সরকারের আমলের ব্যাংক দখলদারদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। সেটিও উদ্বেগ সৃষ্টি করে সর্বমহলে। পরে সেটি বাতিল করা হলেও মানুষের উদ্বেগ কাটেনি।
এসব ঘটনায় নতুন সরকারের কাজের একটা রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছে, যা সুশাসনের নয়; বরং বিপরীত কিছুর আভাস দেয়।
একজন অর্থনীতিবিদ পত্রিকাটিকে বলেন, আর্থিক খাতের ওপর আস্থার সঙ্কট দূর করতে হলে দু’টি কাজ করতে হবে। জালজালিয়াতির সাথে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত লুটের অর্থ আদায় করা। কোনোটিই দৃশ্যমান নয়।



