মিরপুরে বৃদ্ধা মায়ের করুণ মৃত্যু, বস্তুবাদী সভ্যতা সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে

মিরপুরের ঘটনা আমাদের সমাজের একটি গভীর ক্ষতের প্রকাশ মাত্র। অবিলম্বে এই ক্ষতের ‘চিকিৎসায়’ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এটি যে আরো বাড়বে— তা বলাই বাহুল্য।

মা-বাবাকে একাকী ফেলে রেখে সন্তানের অন্যত্র বসবাস কিংবা অযত্ন-অবহেলায় তাদের নিঃসঙ্গ করুণ মৃত্যু— এসবই বস্তুবাদী সভ্যতার কুফল। পশ্চিমা দেশে এগুলো বহুদিন ধরে চলে আসছে। দুঃখজনক হলেও এসব ঘটনা এখন বাংলাদেশেও ঘটছে। বস্তুবাদী সভ্যতা বাংলাদেশের এক সময়ের দরদি সমাজকে এখন কুরে কুরে খাচ্ছে।

মিরপুরের পল্লবীতে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামে এক বৃদ্ধার নিঃসঙ্গ করুণ মৃত্যু সমাজকে নাড়া দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— বৃদ্ধার লাশটি উদ্ধার করা হয় গত ৩১ মে। নূরজাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্মসচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। মেয়ের সাথে তিনি একই বাসায় থাকতেন। নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধারের পর তার বসবাসের ঘরের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, পুরো ফ্ল্যাট নোংরা অপরিচ্ছন্ন— একেবারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তার মৃতদেহের চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, লাশ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন। ধারণা করা হচ্ছে— নূরজাহান বেগম বেশ কয়েক দিন আগে মারা গেছেন।

একই বাসায় থেকে মায়ের করুণ মৃত্যু হলো, অথচ পাশের রুমে থাকা মেয়ে তা টের পেলেন না— এ ঘটনা হতবাক করে। এটিই প্রমাণিত হয়, মেয়ে মায়ের কোনো সেবাযত্ন করতেন না, কিংবা মায়ের প্রতি তার কোনো দায়িত্ববোধ ছিল না।

বস্তুবাদী সংস্কৃতিতে সম্পদ অর্জন, ভোগ-বিলাস কিংবা বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে নীতি-নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ কিংবা বহুদিনের পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতি মানুষের কাছে গৌণ হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থই মানুষের কাছে মুখ্য হয়ে উঠছে। ফলে নিজের জন্মদাতা মা-বাবাকেও সে ত্যাগ করছে। এ কারণে শিক্ষিত সন্তান-সন্ততি থাকার পরও বৃদ্ধা মায়ের কোনো কাজে আসছে না।

বৃদ্ধা মায়ের এমন করুণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট একদিনে তৈরি হয়নি। তাই এর সমাধানও স্বল্প সময়ে করা সম্ভব নয়।

নূরজাহানের মতো যেসব মা কিংবা বাবা তাদের প্রিয় সন্তানের কাছ থেকে অবহেলার শিকার হচ্ছেন, তারা নিজেরাও বুঝতে পারছেন না— কেন তাদের সাথে এমন হচ্ছে। তাই সমস্যাটি মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে হলেও এর বৃহত্তর সমাধান তাদের হাতে নেই। এ জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে সমন্বয় করে এগিয়ে আসতে হবে।

পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের যে শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশে বিদ্যমান তার অবসান ঘটাতে হবে। বরং বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির আলোকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।

ব্যক্তি-স্বাধীনতা কিংবা স্ব-নির্ভরতার নামে মা-বাবাকে একাকী ফেলে জীবিকার সন্ধানে সন্তানের দূর-দূরান্তে চলে যাওয়ার যে অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

ছোটবেলা থেকেই সন্তান যাতে ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যথাযথ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মা-বাবার ভরণপোষণের যে আইন রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

মিরপুরের ঘটনা আমাদের সমাজের একটি গভীর ক্ষতের প্রকাশ মাত্র। অবিলম্বে এই ক্ষতের ‘চিকিৎসায়’ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এটি যে আরো বাড়বে— তা বলাই বাহুল্য।