সন্দেহজনক মুক্তিযোদ্ধা সনদ

অপব্যবহার-জালিয়াতি বন্ধ হোক

রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে চায়, সেটি হতে হবে ন্যায়বিচার, সমতা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, ইতিহাসকে সম্মান জানাতে হবে; কিন্তু ইতিহাসের নামে বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি না করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি। এ শব্দের সাথে জড়িয়ে আছে ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আত্মমর্যাদার ইতিহাস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেই মহিমান্বিত ইতিহাসের নাম ব্যবহার করে বারবার অনিয়ম, অপব্যবহার এবং বঞ্চনার চিত্র সামনে আসছে। সহযোগী একটি দৈনিকের খবর, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি পাওয়া অন্তত আট হাজার ব্যক্তির সনদ ও তথ্য সন্দেহজনক। এ সংখ্যা শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা গভীর রোগের লক্ষণ।

প্রশ্ন উঠছে— কিভাবে ভুয়া তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হলো? এর পেছনে নিশ্চয় শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের ইতিহাস আছে। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা’— এ দুই শব্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ সুবিধা নেয়া হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন।

সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা চালুর কারণ ছিল, যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, তাদের ও তাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই নীতি যখন বিস্তৃত হয়ে সন্তান, নাতি-নাতনী পর্যন্ত পৌঁছায় এবং পরিমাণ যখন ৩০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তা ন্যায়তা হারায় বৈকি। প্রতিযোগিতামূলক সমাজে বৈষম্যের কারণ হয়ে ওঠে। এর সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী ভুয়া সনদ তৈরি করে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেছে। এতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে।

এ বঞ্চনা-বৈষম্যের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত চব্বিশের পটভূমি তৈরি করে। বৈষম্যমুক্ত ও কোটামুক্ত চাকরির দাবিতে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন একপর্যায়ে তীব্র জনবিক্ষোভে রূপ নেয়। এতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। অর্থাৎ, ‘চেতনা’র নামে যে অপব্যবহার চলছিল, তা-ই একসময় ক্ষমতার ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়।

নতুন বাংলাদেশের সূচনার পর স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা ছিল— অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া হবে। স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে; কিন্তু ফের সেই পুরনো বয়ান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ সামনে রেখে বিশেষ সুবিধা আদায়ের প্রবণতা আবার যদি মাথাচাড়া দেয়, তবে তা হবে নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক।

একাত্তর আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মর্মবাণী— ন্যায়, সমতা ও গণমানুষের অধিকার; কিন্তু এ চেতনার নামে যদি আবার বাণিজ্য, সুবিধাবাদ এবং বঞ্চনা চালু হয়, নিশ্চয় এটি ইতিহাস অবমাননার নামান্তর। এটি ভবিষ্যতের জন্য হুমকি তৈরি করবে। সঙ্গত কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি হলো— কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক তদবিরের কাছে নতি স্বীকার না করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাদের সনদ সন্দেহজনক প্রমাণিত হবে; তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থ নেয়া। সেই সাথে একটি শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতির সুযোগ না থাকে।

রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে চায়, সেটি হতে হবে ন্যায়বিচার, সমতা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, ইতিহাসকে সম্মান জানাতে হবে; কিন্তু ইতিহাসের নামে বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি না করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।