অস্তিত্ব সঙ্কটে মাথাভাঙ্গা নদী, দখল-দূষণ মুক্ত করুন

হাজারো নদ-নদী আমাদের দেশকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু সময়ের আবর্তে বিশেষ করে কয়েক দশক ধরে এ দেশের নদ-নদীগুলো দখল-দূষণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এতে আমাদের জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। সেই সাথে নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে দিন দিন।

দেশে নদী দূষণের প্রধান কারণ : অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য, নগরায়নের ফলে সৃষ্ট পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য, কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, প্লাস্টিক দূষণ এবং নদী তীরে অবৈধ বর্জ্য ফেলার প্রবণতা। বিশেষ করে, চামড়া ও বস্ত্রশিল্পের ভারী ধাতু এবং নদী তীরবর্তী পৌরসভাগুলোর বর্জ্য নদীগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, যা দেশের নদ-নদীকে মৃতপ্রায় করে তুলেছে।

দখলে-দূষণে বিপন্নপ্রায় একটি নদীর নাম চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাথাভাঙ্গা। পাউবোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় মাথাভাঙ্গা নদীর গড় প্রশস্ততা ৯৫ মিটার। বর্ষা মৌসুমে পানির গড় গভীরতা থাকে ৯ দশমিক ৫০ মিটার। শুষ্ক মৌসুমে গড়ে তা ১ দশমিক ২৫ মিটারে নেমে আসে। তখন নদীর অনেক স্থান শুকিয়ে যায়। ফলে নদীতে নৌ চলাচলের কোনো অবস্থা থাকে না।

সহযোগী একটি দৈনিকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দখল-দূষণে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদী। এক সময়ের খরস্রোতা আন্তঃসীমান্ত নদীটি এখন মূলত ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে করে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ক্ষতির শিকার নদীর পানি দিয়ে সেচকাজ চালানো কৃষক। দূষণের কারণে এ নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এতে জীবিকা হারিয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপাকে পড়েছেন এই নদীর ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবীরা।

অবস্থা এমন যে, নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা গড়ে চলছে নদী দখল। কিন্তু দেখার কেউ নেই। সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর এ নিয়ে উদাসীন। এ ছাড়া জেলা শহরের বেশির ভাগ ড্রেনের ময়লা পানি ও আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ অবস্থায় নিজস্ব স্রোতধারা নিয়ে অস্তিত্ব হারানোর পথে মাথাভাঙ্গা নদী। নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দা এবং নদী তীরবর্তী হাটবাজারের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় এর পানি দূষিত হয়ে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ভয়াবহ দূষণে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সঙ্গত কারণে এখনই উদ্যোগ না নিলে মাথাভাঙ্গা নদী অস্তিত্ব হারাবে।

মাথাভাঙ্গার এই দূষণের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা। পৌরসভার প্রায় সব ক’টি ড্রেনের মুখ নদীতে ফেলা হয়েছে। যার ফলে অপরিশোধিত ব্যাপক ময়লা-আবর্জনা এবং দূষিত পানি, এমনকি দেখা গেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার বাসিন্দাদের কারো কারো বাসার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার স্যুয়ারেজ লাইনও সরাসরি ড্রেনে ফেলা হয়েছে। সেই ড্রেনের মাধ্যমে স্যুয়ারেজ ও পয়ঃবর্জ্য মাথাভাঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়ছে।

মাথাভাঙ্গা নদীর সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৈরব, কুমার, চিত্রা ও নবগঙ্গা নদ-নদীর সংযোগ রয়েছে। যদি মাথাভাঙ্গা নদী না বাঁচে, তা হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এসব নদ-নদী বাঁচবে না। নদ-নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার। একই সাথে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনের বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা শোধনে একটি বৃহৎ পরিকল্পনা দ্রুত হাতে নিতে হবে।