রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারো ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে শুক্রবার। উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি। এর মাত্রা ছিল মাঝারি। কয়েক সেকেন্ড কেঁপে তারপর স্বাভাবিক হয়ে গেছে জীবন; কিন্তু সত্যিই কি সব স্বাভাবিক হয়েছে?
কিছুদিনের ব্যবধানে একাধিক ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমরা এমন এক ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছি, যাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ বড় কোনো ফল্ট লাইনের কেন্দ্রস্থলে না হলেও পাশের অঞ্চলের সক্রিয়তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা– অসংগঠিত ও অপ্রস্তুত এক নগরী। একটি মাঝারি থেকে বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে আছে ঢাকা।
ঢাকার বাস্তবতা আমরা সবাই জানি; কিন্তু স্বীকার করতে চাই না। প্রকৌশলগত মানদণ্ড না মেনেই গড়ে উঠেছে অগণিত বহুতল ভবন। পুরান ঢাকার মতো এলাকার ভবনগুলোর একটি অন্যটির গায়ে হেলে আছে। মাঝখানে সরু গলি, জরুরি যানবাহন প্রবেশের প্রায় অযোগ্য। নতুন ঢাকাতেও চিত্র খুব ভিন্ন নয়। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভবন ধস, গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা– সবমিলিয়ে যে চিত্র তৈরি হতে পারে, তা কল্পনা করাও কঠিন। উদ্ধারকাজ পরিচালনার সক্ষমতা, চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতি, যোগাযোগব্যবস্থার বিকল্প ব্যবস্থা– সবকিছুই তখন কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে।
ভূমিকম্প হলেই আমাদের দেশে আলোচনা শুরু হয়। সেমিনার, টকশো, পরিকল্পনার ঘোষণা, বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা– সবই হয়; কিন্তু কিছুদিন পর সব থেমে যায়। নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হালনাগাদ করা হয় না। স্কুল-কলেজে ভূমিকম্পের মহড়া দেয়া হয় না। যেন আমরা ধরেই নিয়েছি, বড় কিছু হবে না; কিন্তু ভূমিকম্পের ইতিহাস বলে– অপ্রস্তুত নগরীর জন্য মাঝারি মাত্রার কম্পনও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
এখন প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদের। রাজধানীতে অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কাঠামোগত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর ফলাফল প্রকাশ্যে আনতে হবে। জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো দরকার। বছরে অন্তত একবার মহড়া আয়োজন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকার, স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক দলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রাথমিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তিগত নয়, মানসিকতা। আমরা ঝুঁকিকে স্বীকার করতে চাই না, নিয়ম মানতে চাই না, তদারকিকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কাছে দুর্বল করে ফেলি; কিন্তু প্রকৃতি কোনো ছাড় দেয় না। একটি বড় ভূমিকম্প আমাদের উন্নয়ন, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করে দিতে পারে।
ভূমিকম্প থামানো আমাদের হাতে নেই; কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্পূর্ণ আমাদের দায়িত্ব। প্রতিটি ছোট কম্পন একটি সতর্কবার্তা। আমরা কি সেই বার্তা শুনব, নাকি আগের মতোই আতঙ্ক কাটলে সব ভুলে যাবো? আজ যে পদক্ষেপ নেয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের কোনো অঘটনে আমরা কেবল শোকগাথা লিখব, নাকি প্রস্তুতির সাফল্যের কথা বলব।



