প্রাথমিকের শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানা যাচ্ছে এই ক্ষেত্রে পুরনো নিয়ম ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এতদিন আবেদন ও যাচাই বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন হতো। এখন কাজটি সনাতন পদ্ধতিতে করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। নতুন নিয়ম অনুযায়ী বাছাই কমিটিতে দু’জন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটির এই নতুন সদস্যরা কারা হবেন তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির কারণে আমাদের দেশে সরকারি কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে। এই অবস্থায় বদলি ও পদায়নে দুর্নীতি-অনিয়মের বিস্তার ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের চার স্তরের কমিটি আবেদন যাচাই বাছাই ও নিষ্পত্তি করবে। কমিটির সভাপতি হবে যথাক্রমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব। বিতর্কের জায়গাটি হচ্ছে- প্রথম তিন স্তরের কমিটিতে দু’জন করে গণ্যমান্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি। তাদের নিয়োগ করবেন আবার কমিটির সভাপতি। ফ্যাসিবাদী আমলে শিক্ষা প্রশাসন ধসে পড়েছিল। সেখানে নিয়ম কানুনের কোনো বালাই ছিল না। পুরো ব্যবস্থা ক্ষমতাসীন চক্রের সিন্ডিকেটের আওতায় চলে গিয়েছিল। তবে প্রাথমিকের বদলি ও পদায়নে অনলাইন ব্যবস্থা থাকায় ন্যূনতম একটি শৃঙ্খলা বজায় ছিল।
নতুন নিয়মে গণ্যমান্য বলতে কাদের বোঝানো হবে তা সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এসব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। বদলি পদায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য একে একটি নিয়মের আওতায় রাখার বিকল্প নেই। অতীরের মতো সিন্ডিকেট গড়ে উঠলে দেখা যাবে বদলি-পদায়নে তদবির ও ঘুষবাণিজ্য বিস্তার ঘটছে। পেশাগত উৎকর্ষ সাধন ও প্রয়োজনীয়তার বদলে কমিটির পছন্দ অগ্রাধিকার পাবে। গণ্যমান্য ব্যক্তির পরিচয়ে থাকা সদস্যরা পুরো ব্যবস্থার ওপর অযাচিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
সরকারের বিভিন্ন কাজে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে দুর্নীতি কমানো ও কাজের দক্ষতা বাড়ানো যাচ্ছে। এই অবস্থায় শিক্ষায় সনাতন পদ্ধতি আরোপ পেছনের দিকে হাঁটার শামিল। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশে একটি বিশাল কর্মকাণ্ড। দেশের ৬৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাড়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষক এবং এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী। এই বিপুল কর্মকাণ্ডকে যতটা ডিজিটালাইজ করা যায় ততই শিক্ষা কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়বে। শিক্ষকের শূন্য পদের তথ্য, চাকরির মেয়াদ, কর্মস্থল ও বাসস্থানের দূরত্ব, পারিবারিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্যগত তথ্য বদলি ও পদায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সনাতনি পদ্ধতিতে এই তথ্যভাণ্ডার বিবেচনা করা এখন বোকামি। একটি ডাটাবেজের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সিস্টেমের আওতায় উপজেলাকেন্দ্রিক সহকারী শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নের কাজটি নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে খুব সহজে ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা যায়।
প্রাথমিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি ও অনিয়ম থেকে একে বাঁচাতে হবে। এ জন্য প্রাথমিক শিক্ষকদের নিয়োগ-বদলি ও পদায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার নীতি নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার যেন কোনো ধরনের ছাড় না দেয়।



