ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতার ঘটনা তত বাড়ছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের এ নিয়ে মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। থাকলে নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারতেন না, এবারের নির্বাচনে ভালো পরিবেশ বজায় রয়েছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারতেন না।
এবারের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়াচিং অ্যালায়েন্স (ইডব্লিউএ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, রাজনৈতিক সহিংসতা, কালো টাকার ব্যবহার এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজন নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের অন্তত ৩৩টির বেশি জেলা ও প্রায় ৫০টি সংসদীয় আসনে এখন পর্যন্ত ১৩১টির বেশি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রার্থী, কর্মী ও ভোটাররা নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ছেন। সেই সাথে নির্বাচনী সমতার পরিবেশ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তীব্রভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর মধ্যে শেরপুর জেলায় জামায়াতের এক স্থানীয় নেতা বিএনপি নেতাকর্মীর হাতে নিহত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী কর্মীরা লাঞ্ছিত এবং হামলার শিকার হয়েছেন।
এই যখন নির্বাচনী মাঠের অবস্থা তখন গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবুল ফজল মো: সানাউল্লাহ বলেন, ‘সার্বিকভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় যে পরিবেশ থাকে, সেই তুলনায় এবারের পরিবেশ ভালো। এটি হচ্ছে আমাদের ওভারঅল অ্যাসেসমেন্ট’। তবে ইডব্লিউএ যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে তাই নির্বাচনী মাঠের প্রকৃত বাস্তবতা বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। সঙ্গত কারণে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে ইসির যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে তা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং নির্বাচনী কার্যক্রমের শুরু থেকে ইসির মধ্যে একধরনের দুর্বলভাব স্পষ্ট। প্রার্থী বাছাইয়ে দুর্বলতায় ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেয়েছেন। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির এমন ব্যর্থতা সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত।
নির্বাচনে ইসি রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা। কেউ বেআইনি কিছু করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা; কিন্তু ইসির মধ্যে এমন মানসিকতা কম দেখতে পাচ্ছি। বরং একটি পক্ষে যেন ইসি ঝুঁকে পড়ছে, যা সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্তরায়। লক্ষণীয়, ইসি যে পক্ষের দিকে ঝুঁকছে, সেই দলের নেতার্মীরা আরো বেপোরোয়া হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এতে নির্বাচনের পরিবেশ আরো বিঘ্নিত হবে, এটি সহজে অনুমেয়।
এমতাবস্থায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর যে কয়দিন বাকি আছে, এ সময়ে যাতে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায়ে থাকে সে জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে ইসিকে। ফ্যাসিবাদী জমানার মতো কেউ জোর করে কিছু করুক আর ইসি তা নীরব ও নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখকু, জনগণ তা প্রত্যাশা করে না। ইসির কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকার মধ্য দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, এটিই গণতন্ত্রকামী সবার প্রত্যাশা।



