সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার পাঙ্গাসী গ্রামে বসবাস করে আসমা খাতুন। স্বামী কৃষি কাজ করে। স্বামীর কাজে সহযোগিতা করে আসমা। আসমার তিন ছেলে, তিন মেয়ে। ছোট মেয়ে আসিয়া। বয়স ১১ বছর। আসিয়া সকাল হতে না হতেই ঘুম থেকে উঠে চলে যায় বাড়ির বাইরে। সারাদিন ব্যস্ত থাকে সমবয়সিদের সাথে খেলাধুলা নিয়ে।
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে করতোয়া নদী। আষাঢ় মাস। নদীতে পানি থই থই করছে। নদীতে স্রোত আছে।
বাড়ির ঘাটে নৌকা বাঁধা। নৌকায় বসে সবাই মিলে খেলা করছে। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ। নদীর ঘাটে এসে দেখে আসিয়া নৌকা থেকে পানিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। অন্য বান্ধবীরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু কেউ তাকে নদী থেকে তুলতে পারছে না। অবশেষে আসিয়ার চাচা নদী থেকে আসিয়াকে তুলে আনে। বেঁচে যায় আসিয়ার জীবন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিশু মারা যায়। এদের বয়স ২ বছর থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। দেশে শিশুমৃত্যু রোধে এবং বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং তাতে সফলও হয়েছে।
কিন্তু পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে খুব বেশি একটা অগ্রগতি এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে ৫ বছরের কম বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া। এরপরই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর স্থান প্রায় ৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফলতার দিক থেকে ডায়রিয়ায় মৃত্যুরোধে বাংলাদেশ এক নম্বর। গণটিকা দেয়ার কারণে ডিফথেরিয়া বলতে গেলে একেবারেই নেই। ধনুষ্টংকার এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য এ দেশে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর তিনটিই বাংলাদেশের সাফল্যের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। এগুলো হলো- পুকুরের পাড়ে বেড়া দেয়া, শিশুর জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং শিশুকে সাঁতার শেখানো।
শিশুদের সাঁতার শেখার বিষয়ে স্কুলের শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রতিটি মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন ব্যায়াম করা প্রয়োজন। সাঁতার একটি উত্তর ব্যায়াম। আর এ কারণে প্রতিটি মানুষের পানিতে সাঁতার কাটা অত্যন্ত জরুরি। সাঁতারের মাধ্যমে অনেক রোগ ব্যাধি থেকে মানুষ মুক্ত থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শিক্ষকেরা ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তুলে ধরতে পারেন।
একজন মানুষ সাঁতার জানলে কী কী সুবিধা ভোগ করতে পারে এবং সাঁতার না জানলে কী কী অসুবিধাগুলো সন্মুখীন হতে পারে, তা বিভিন্ন মিডিয়ার/গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এর ফলে মানুষ সাঁতার কাটতে উদ্বুদ্ধ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুমৃত্যু কমাতে প্রসূতিদের জরুরি স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়। এ সময় স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শের সাথে শিশুর পানিতে ডুবে যাওয়ার বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে। এছাড়া সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যে সকল এলাকায় ডোবা, নালা, পুকুর অথবা নদী আছে। সে সকল এলাকার মা, বাবাসহ পরিবারের সকলের সচেতন হতে হবে, যাতে কোনো শিশু পানির দিকে যেতে না পারে।
এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই আমাদের শিশুরা পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
সূত্র : বাসস



