অমরত্বের প্রাচীন অলৌকিক সন্ধান ও রূপকথা
মানুষের চিরকাল বেঁচে থাকার আকুল স্বপ্ন আজকের নয়। আদিম কাল থেকেই মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার নানা অলৌকিক উপায় খুঁজে এসেছে। যখন পৃথিবীর অজানা প্রান্ত নিয়ে মানুষের কল্পনার শেষ ছিল না, তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এক অদ্ভুত গুজব—পৃথিবীর কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে 'আবে হায়াত'। এমন এক অলৌকিক ঝরনা, যার পানির মাত্র এক চুমুক পানি মানুষকে চিরকালের জন্য মৃত্যুহীন ও অমর করে দিতে পারে।
এই রহস্যময় খবরের কথা গিয়ে পৌঁছাল বিশ্ববিজয়ী মহাবীর সিকান্দার কানে। সারা পৃথিবী জয়ের নেশায় মত্ত থাকা এই শাসক ভেবেছিলেন, 'যদি যুদ্ধ জয়ে সম্পূর্ণ পৃথিবী জয় করা যায়, তবে সামান্য মৃত্যুকে কেন জয় করা যাবে না?' এই অদম্য বাসনা নিয়ে তিনি এক বিশাল সেনাবাহিনী সাথে নিয়ে রওনা হলেন সেই অলৌকিক ঝরনার সন্ধানে। লোককথা বলে, তার সাথে ছিলেন রহস্যময় সাধক খিজির। পথ চলতে চলতে তারা এমন এক অন্ধকার দেশে গিয়ে পৌঁছালেন, যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাত না। সেখানে গিয়ে একসময় দুজনের পথ আলাদা হয়ে গেল।
ভাগ্যের অদ্ভুত পরিহাসে সাধক খিজির হঠাৎ শুনতে পেলেন কলকল পানির মিষ্টি শব্দ। এগিয়ে গিয়ে তিনি দেখলেন এক স্বচ্ছ পানির ঝরনা। তৃষ্ণা মেটাতে তিনি সেই পানি পান করলেন। পরে জানা গেল, সেটিই ছিল সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত 'আবে হায়াত'। সেই থেকে লোককথায় প্রচলিত হলো—খিজির চিরঞ্জীব হয়ে গেলেন এবং যুগে যুগে পথহারা মানুষকে পথ দেখাতে লাগলেন। অন্যদিকে বিশ্বজয়ী মহাবীর সিকান্দার সারাজীবন তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই ঝরনার দেখা পেলেন না। পৃথিবীর অগণিত রাজ্য জয় করে একচ্ছত্র অধিপতি হয়েও তিনি মৃত্যুকে জয় করতে পারলেন না।
আরও পুরোনো এক মেসোপটেমীয় কাহিনিতে দেখা যায় রাজা গিলগামেশের গল্প। পরম প্রিয় বন্ধুর আকস্মিক মৃত্যু তাকে এতটাই ভীত ও ব্যাকুল করেছিল যে, তিনিও অমরত্বের অলৌকিক সন্ধানে বের হয়ে পড়েছিলেন। বহু কষ্ট ও ত্যাগের পর তিনি এমন এক অলৌকিক উদ্ভিদ খুঁজে পান, যা মানুষকে দীর্ঘজীবী করতে পারে। কিন্তু চরম ক্লান্তিতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি সাপ এসে সেই অলৌকিক উদ্ভিদটি চুরি করে খেয়ে ফেলে। রাজা গিলগামেশ খালি হাতে নিজের রাজ্যে ফিরে যান। আর মানবজাতি সেদিনই বুঝে যায়—মৃত্যুকে ফাঁকি দেয়া এত সহজ কাজ নয়।
আধুনিক বিজ্ঞানের দরবারে প্রাচীন রূপকথা
হাজার বছর আগের এই দুই গল্পের মূল বার্তা একই—মানুষ যুগে যুগে আবে হায়াত খুঁজেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে এক কঠিন সত্য। অমরত্ব কোনো অলৌকিক ঝরনার পানি বা উদ্ভিদে থাকে না। রূপকথার সেই অধরা সত্যকেই কি আজ আধুনিক বিজ্ঞান নতুন করে রূপ দিচ্ছে? বিজ্ঞান সাময়িকী 'এনপিজে এজিং'-এ প্রকাশিত এক গবেষণার খবর নিয়ে 'সায়েন্স অ্যালার্ট' পেজে বিজ্ঞান সাংবাদিক মিশেল স্টার সম্প্রতি এমনই এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যদি ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ দিয়ে বয়সের প্রভাব বা সব ধরনের দূরারোগ্য ব্যাধিকে জয়ও করতে পারে, তবুও মানুষের অমর হওয়া বৈজ্ঞানিক ও জৈবিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। বিখ্যাত রকব্যান্ড কুইন যখন গান গেয়েছিল 'হু ওয়ান্টস টু লিভ ফরেভার', তা ছিল এক সুরের প্রশ্ন। কিন্তু মানুষের সহজাত উত্তর সবসময় ছিল অমর হওয়ার পক্ষে। তবে রাশিয়ার বিখ্যাত 'স্কোলকোভো ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি'-র বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম গাণিতিক সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, মানুষের শরীরে স্থায়ী অমরত্ব পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কোষের ক্ষয় ও ডিএনএ-র সূক্ষ্ম রূপান্তর
একসময় জীববিজ্ঞানীর হাতে থাকত মূলত টেস্টটিউব আর অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এখন তাঁর আরেকটি অস্ত্র—সুপারকম্পিউটার। এই দুই জগতের মিলনেই জন্ম হয়েছে কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্টের। তিনি কোটি কোটি জৈব তথ্যের ভেতর ডুব দিয়ে খুঁজে বেড়ান জীবনের গুপ্ত সংকেত—কোন জিন বার্ধক্য ডেকে আনে, কোনটি আয়ু বাড়াতে পারে, আর কোন পরিবর্তন মানুষের শরীরকে আরও দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে পারে।
কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট দিমিত্রি ক্রিউকভের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের দলটি এক সহজ অথচ গভীর গাণিতিক প্রশ্ন তুলেছিলেন: যদি মানবশরীরের বার্ধক্যজনিত ক্যান্সার, হৃদরোগ বা ডিমেনশিয়ার মতো বড় বড় ব্যাধিগুলোকে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যায়, তবুও কি মানবদেহ চিরকাল বেঁচে থাকবে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি কোষ বিভাজিত হচ্ছে। প্রতিটি কোষ বিভাজনের সময় মানবদেহের মূল নকশা বা ডিএনএ-তে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিছু ভুল কিংবা পরিবর্তন জমা হতে থাকে। বিজ্ঞান ও চিকিৎসার ভাষায় এগুলোকে বলা হয় 'সমেটিক মিউটেশন'। মানবদেহ এই সূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো মেরামত করতে অত্যন্ত দক্ষ হলেও তা শতভাগ নিখুঁত নয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানবশরীরের প্রতিটি কোষে এই রূপান্তর বা ডিএনএ-র ভুলগুলো জমতে জমতে একসময় স্তূপ হয়ে যায়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মিউটেশনগুলো ক্ষতি করে না, তবে কিছু মিউটেশন প্রাণঘাতী রোগের জন্ম দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ধরুন মানবসমাজ যদি এমন এক চিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কার করে ফেলে যা ক্যান্সার ও বয়সের সব ক্ষতিকারক প্রভাব আটকে দিতে পারে—তবুও কোষের ভেতরে ডিএনএ-র এই মিউটেশন জমা হওয়া থামানো যাবে না। ফলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে।
মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের সহনশীলতার পরম সীমাবদ্ধতা
গবেষণায় একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। আমাদের শরীরের সব ধরনের অঙ্গের সহনশীলতা এবং ক্ষমতা কিন্তু এক নয়। মানবদেহের ত্বকের কোষ বা যকৃৎ প্রতিনিয়ত পুরনো কোষ ফেলে দিয়ে নতুন কোষ তৈরি করতে পারে। এই ধরনের অঙ্গগুলো পুনর্জন্মের মাধ্যমে দীর্ঘসময় পর্যন্ত নিজেদের সতেজ রাখতে সক্ষম।
কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অঙ্গ—মস্তিষ্ক এবং হৃদযন্ত্রের কোষগুলো অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। এগুলোর বেশিরভাগ কোষ সারা জীবনে নতুন করে তৈরি বা প্রতিস্থাপিত হয় না। ফলে একজন মানুষ যখন বড় হতে থাকে এবং তার বয়স বাড়তে থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের কোষগুলোতে বছরের পর বছর ডিএনএ মিউটেশন জমতে থাকে সবচেয়ে বেশি হারে। দীর্ঘজীবী এই গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর নিয়মিত বায়োলজিক্যাল ক্ষয়ই দিনশেষে মানবদেহের টিকে থাকার পরম সীমানা নির্ধারণ করে দেয়।
পরম আয়ু কত বছর হতে পারে?
দিমিত্রি ক্রিউকভ ও তার গবেষক দল যে গাণিতিক হিসাব প্রকাশ করেছেন, তা কিন্তু কোনো অনুমাননির্ভর ভবিষ্যৎবাণী নয়। এটি একটি কাঠামোগত বৈজ্ঞানিক চিন্তার পরীক্ষা (থট এক্সপেরিমেন্ট)। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, সমস্ত রোগ প্রতিরোধ করার পরও সমেটিক মিউটেশনের হারের কারণে মানুষের গড় পরম আয়ু সর্বোচ্চ ১৪৬ থেকে ১৯৪ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুবিধাজনক ও অনুকূল পরিবেশে এই পরম আয়ু বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ১৫০ থেকে ১৯০ বছরের মধ্যে আটকে যাবে। বর্তমানে পৃথিবীর আদর্শ ও ভালো পরিস্থিতিতে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৯ বছর। বিজ্ঞান ও চিকিৎসার চরম অগ্রগতির মাধ্যমে হয়তো মানুষের জীবনকাল বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করে দেয়া সম্ভব, কিন্তু অমর হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। ক্রিউকভ উল্লেখ করেছেন, এটি কোনো ভাগ্যের অমোঘ রায় নয়, তবে এটি স্পষ্ট করে যে কোষের এই নিজস্ব মিউটেশনই বার্ধক্যের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
সত্যিকারের অমরত্ব লুকানো কোথায়?
বিশ্ববিজয়ী সিকান্দর বা মেসোপটেমিয়ার রাজা গিলগামেশের যুগের মতো আধুনিক বিশ্বও আজ একই প্রশ্নের মুখোমুখি। বিজ্ঞানীরা হয়তো একদিন জিন প্রকৌশল, কোষ পুনরুজ্জীবন কিংবা নতুন ওষুধের সাহায্যে মানুষের পরম আয়ু ২০০ বছরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু শরীরের প্রতিটি কোষে সময়ের সঙ্গে জমতে থাকা প্রাকৃতিক মিউটেশন ও ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দেবে।
মনে হয়, গায়ক সুমন যেন অনেক আগেই এই নশ্বরতার সত্যটি অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি সুর তুলেছিলেন, অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো দাবি-দাওয়া/ এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া।/...ছেঁড়া তালপাতা পুঁথির পাতায় নিঃশ্বাস ফেলে হাওয়া,/ এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই পাওয়া।
বিজ্ঞান যেন সেই প্রাচীন মানবসত্যকেই নতুন ভাষায় আমাদের সামনে তুলে ধরছে। মৃত্যুহীন অমরত্ব কোনো অলৌকিক ঝরনার পানিতে লুকিয়ে নেই; নেই কোনো জাদুকরী ওষুধ বা প্রযুক্তির হাতেও। মানুষের প্রকৃত অমরত্ব বেঁচে থাকে তার সততা, সৃজন, জ্ঞান, ভালোবাসা এবং মানবসমাজের জন্য রেখে যাওয়া কাজের মধ্যে। দেহ একদিন নিঃশেষ হয়, কিন্তু মানুষের চিন্তা, কর্ম ও উত্তরাধিকারই তাকে সময়ের সীমানা পেরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে।



