টাকের ওষুধে টাক যায় না, টাকা যায়—শিবরাম চক্রবর্তীর এই রসিকতাটি যেন টাক নিয়ে বাঙালির দীর্ঘশ্বাসেরই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। টাকের ওষুধের অবশ্য কমতি নেই। প্রাচীন ভেষজ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বশেষ দাওয়াই—কোনটার নাম লিখবেন, আর কোনটা বাদ দেবেন! এমনকি টাক সারানোর যোগব্যায়ামের কথাও শোনা যায়। কিন্তু এবার হয়তো সত্যিই একটু আশার আলো দেখা গেল। আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ মারাত্মক ধরনের অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটায় আক্রান্ত মানুষের মাথার প্রায় পুরো চুল ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।
সায়েন্স এলার্ট ডট কম ৬ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, আপাডাসিটিনিব নামের ওই ওষুধ নিয়ে দুটি তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফল বেশ আশাব্যঞ্জক। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জামা ডার্মাটোলজিতে। প্রতিবেদনটির লেখক ডেভিড নিল্ড।
অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটা এমন এক রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে চুলের গোড়াকেই শত্রু ভেবে বসে। বিশ্বের প্রায় ২ শতাংশ মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। সুখের কথা, চুলের গোড়া সাধারণত স্থায়ীভাবে নষ্ট হয় না। তাই রোগটি উল্টে দেওয়া সম্ভব। বিপত্তি হলো, শরীরের এই ভুল আক্রমণ কীভাবে থামানো যাবে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ এখনো সীমিত। আর যেসব চিকিৎসা আছে, সেগুলোও সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে না।
সেখানেই আপাডাসিটিনিবকে নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ। ওষুধটি প্রদাহ কমাতে এবং আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটার কিছু কিছু প্রচলিত ওষুধের সঙ্গে এর কার্যপ্রক্রিয়ায় মিল থাকায় গবেষকেরা এবার দেখতে চাইলেন, মাথার চুলের ক্ষেত্রেও এটি কোনো চমক দেখাতে পারে কি না। দুটি পরীক্ষায় মোট ১ হাজার ৩৯৯ জন অংশ নেন। তাঁদের বয়স ১২ থেকে ৬৪ বছর। এর মধ্যে ১১৮ জন ছিলেন কিশোর-কিশোরী। সবারই অন্তত ৫০ শতাংশ মাথার চুল পড়ে গিয়েছিল।
২৪ সপ্তাহ ধরে অংশগ্রহণকারীদের প্রতিদিন ১৫ মিলিগ্রাম বা ৩০ মিলিগ্রাম আপাডাসিটিনিব, অথবা প্লাসিবো বা ছল-ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর চুল ফিরে আসার মাত্রা মাপা হয় ‘সাল্ট’ স্কোরে। এটি অ্যালোপেশিয়া কতটা গুরুতর, তা নির্ণয়ের একটি প্রচলিত মাপকাঠি। এই স্কোরে ২০ বা তার কম হলে ধরে নেওয়া হয়, মাথার অন্তত ৮০ শতাংশ চুল ফিরে এসেছে। ১৫ মিলিগ্রাম আপাডাসিটিনিব নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দুটি পরীক্ষায় যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ২ ও ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ এই লক্ষ্য অর্জন করেন। ৩০ মিলিগ্রামের ক্ষেত্রে হার ছিল ৫৫ ও ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। প্লাসিবো নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ১ দশমিক ৫ ও ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আরো চমকপ্রদ খবর আছে। আপাডাসিটিনিব নেওয়া ব্যক্তিদের ১৩ থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশের মাথার সব চুলই ফিরে এসেছে।
গবেষকদের ধারণা, চুলের গোড়ায় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার যে সংকেতের মাধ্যমে আক্রমণ চলে, আপাডাসিটিনিব সেটিই বাধাগ্রস্ত করে। আর কাজ শুরু করতেও বেশি সময় নেয়নি। চিকিৎসা শুরুর আট সপ্তাহের মধ্যেই প্লাসিবোর সঙ্গে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চুল ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরেছে আত্মবিশ্বাসও। ওষুধ নেওয়া ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান এবং নিজেদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে সন্তুষ্টির মাত্রায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। কারণ অ্যালোপেশিয়া শুধু আয়নার সামনে মাথা দেখে মন খারাপ করার বিষয় নয়; রোগটি মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবনেও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি আনন্দের মধ্যেও একটু সাবধান হওয়া দরকার। গবেষণাটি চলেছে মাত্র ২৪ সপ্তাহ। দীর্ঘমেয়াদে ওষুধটির কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী হবে, তা এখনো জানা যায়নি। তার ওপর গবেষণাটি অর্থায়ন ও সহ-পরিকল্পনা করেছে আপাডাসিটিনিব প্রস্তুতকারী ওষুধ কোম্পানি অ্যাবভি। কয়েকজন গবেষকও ওই কোম্পানির কর্মী।
গবেষণাটি অবশ্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। তবু বিদ্যমান চিকিৎসার সঙ্গে এবং প্লাসিবোর বিপরীতে আরো পরীক্ষা দরকার। তারপরই বোঝা যাবে, নতুন এই ওষুধ সত্যিই কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এখানে একটি সতর্কতার কথা বলতেই হয়। এই ফিচার পড়ে কেউ যেন নিজে থেকে আপাডাসিটিনিব খাওয়া শুরু করবেন না। এটি কোনো সাধারণ টাকের ওষুধ বা চুল গজানোর টনিক নয়; চিকিৎসকের পরামর্শ ও ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এমন ওষুধ সেবন করা মোটেও ঠিক নয়। ভুলভাবে বা নিজের ইচ্ছেমতো খেলে গুরুতর, এমনকি মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখেও পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী এবং যাঁরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তাঁদের ওষুধটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। একইভাবে, জি৬পিডি ঘাটতির মতো কোনো বিদ্যমান স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে কিংবা নিয়মিত অন্য ওষুধ সেবন করলে, আপাডাসিটিনিব নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসককের অনুমতি নিতে হবে।
এদিকে, গবেষকেরা বলছেন, দ্রুত এবং ব্যাপক চুল গজানোর এই ফল তীব্র অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটার চিকিৎসায় আপাডাসিটিনিবকে মূল্যবান একটি বিকল্প করে তুলতে পারে।
তাই শিবরামের সেই রসিকতাকে আপাতত একটু পাশে সরিয়েই রাখা যাক। টাকের ওষুধে টাক যাবে, টাকা নয়—এ কথা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি। তবে এবার অন্তত মাথায় চুল ওঠার আশাটাকে নিছক হাসির কথা বলে উড়িয়ে দেওয়ারও উপায় নেই।



