মিষ্টি বিপ্লব: তেতো দাওয়াইয়ের দিন শেষ, বাচ্চাদের জন্য মজাদার ওষুধ আনল ইরান

ফাজেলি আরো বলেন, এটি এমন এক সমাধান যেখানে 'কোনো তেতো বা বাজে স্বাদের ওষুধ থাকবে না এবং সন্তানকে ওষুধ দেয়ার কষ্টও আর থাকবে না।'

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ওষুধ খাচ্ছে ছোট্ট খুশি মোটেও বেজার নয়
ওষুধ খাচ্ছে ছোট্ট খুশি মোটেও বেজার নয় |ওয়ানা

শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর সময় মানেই যেন প্রতিটি ঘরে এক যুদ্ধক্ষেত্র। এক হাতে ওষুধের শিশি আর চামচ, অন্য হাতে নানা ছলাকলা; তাও শিশুর মুখ ঘুরিয়ে কান্না—‘ওষুধ তেতো, খাব না!’ ওষুধ খাওয়ানোর এই চিরাচরিত যন্ত্রণা এবং মা-বাবার দুশ্চিন্তা দূর করতে এবার এক মিষ্টি বিপ্লব ঘটে গেছে ইরানে। সে দেশের একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা প্রথমবারের মতো উদ্ভিদজাত ফর্মুলায় বাচ্চাদের ভিটামিন ও ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করেছেন সুস্বাদু ‘গামি ক্যান্ডি’ বা জেলি ক্যান্ডির রূপ দিয়ে।

ইরানের বার্তা সংস্থা ওয়ানা, বুধবার (১৯ আগস্ট) জানিয়েছে, প্রযুক্তিভিত্তিক ওষুধ উদ্ভাবনের এই অভিনব উদ্যোগ প্রতি বছর দেশটি থেকে প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। পাশাপাশি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সেখানকার সমাজিক প্রেক্ষাপটে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিশু ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে ভুগছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা গামি ক্যান্ডির চমৎকার আকার, রূপ ও স্বাদের ভক্ত। তাই ওষুধের এই নতুন সংস্করণ ভিটামিন খাওয়ার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দেশের ওষুধ শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রেজা ফাজেলি এই পণ্যের বিশেষত্ব সম্পর্কে বলেন, ইরানে প্রথমবারের মতো এই গামি ক্যান্ডির উৎপাদন লাইন চালু করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, 'এই পণ্যে পশুর তৈরি কোনো উপাদান নেই; এতে পশুর হাড় থেকে তৈরি জেলটিন ব্যবহার করা হয়নি। বরং পেকটিন ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর রঙ পুরোই প্রাকৃতিক।'

ফাজেলি আরো বলেন, এটি এমন এক সমাধান যেখানে 'কোনো তেতো বা বাজে স্বাদের ওষুধ থাকবে না এবং সন্তানকে ওষুধ দেয়ার কষ্টও আর থাকবে না।'

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমানে বাজারের জন্য দুটি বহুল ব্যবহৃত পণ্য প্রস্তুত রয়েছে—'চিলড্রেনস মাল্টিভিটামিন' ও 'চিলড্রেনস ভিটামিন ডি'। যেসব শিশু প্রথাগত তেতো বড়ি বা সিরাপ খেতে পারে না, তারা এখন কোনো কষ্ট ছাড়াই আনন্দের সাথে এই সুস্বাদু গামি ক্যান্ডি খেতে পারবে।

পণ্যের গুণগত মান ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে কোম্পানিটির গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপক আমিন ইসমাইলি জোর দিয়ে বলেন, এই গামিগুলো 'সম্পূর্ণ অ্যালার্জি-মুক্ত'। এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় 'প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান যুক্ত করা হয়নি।'

তিনি আরো জানান, এই সাপ্লিমেন্ট তৈরির সব ধাপের ফর্মুলেশন এবং কাঁচামাল সরবরাহের কাজ সম্পূর্ণভাবে ইরানের ভেতরেই সম্পন্ন হচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও স্থানীয় তরুণ গবেষকদের মেধার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

প্রকল্পটি শুরুর মূল ভাবনা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যবস্থাপক মাজিদ লাভাসানি বলেন, বাচ্চারা গামি ক্যান্ডির রূপ ও স্বাদ অত্যন্ত পছন্দ করে। তাই ক্ষতিকর উপাদান বা রাসায়নিক রঙের বদলে গামির ভেতরে মাল্টিভিটামিন ও খনিজ উপাদান যুক্ত করার ভাবনাটি ছিল দুর্দান্ত। এর ফলে শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওষুধ গ্রহণ করবে এবং তাদের ভিটামিনের ঘাটতিও সুন্দরভাবে দূর হবে।

এই অর্জন প্রমাণ করে যে, চিকিৎসা বা ওষুধ তৈরি মানেই সবসময় কড়া জাতের তিতি কোনো বিষয় নয়; বরং সৃজনশীলতার সাথে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সের মেলবন্ধন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

কৃত্রিম রাসায়নিক মুক্ত উপাদান, পুরোপুরি প্রাকৃতিক রঙ ও উৎস, অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কোটি কোটি ডলারের সম্পদ সাশ্রয়ের মাধ্যমে এই গামি ক্যান্ডি এখন ইরানের শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। যার বদৌলতে ওষুধ খাওয়ানোর উৎকণ্ঠার সময়টি প্রতিটি পরিবারের জন্য এখন এক শান্ত, আনন্দদায়ক ও দুশ্চিন্তামুক্ত মুহূর্তে পরিণত হয়েছে।