হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত প্রমোদতরী থেকে যাত্রীদের সরিয়ে নিচ্ছে স্পেন

পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে আশঙ্কা করে শুক্রবার বন্দর শ্রমিকদের একটি দল স্থানীয় পার্লামেন্টের বাইরে জড়ো হয়ে জোরদার প্রতিবাদ জানায়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জাহাজ থেকে সরিয়ে আনার পর টেনারিফে বিমানে ওঠার আগে যাত্রীদের হ্যাজম্যাট স্যুট পরানো হয়েছিল এবং পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়া হয়েছিল
জাহাজ থেকে সরিয়ে আনার পর টেনারিফে বিমানে ওঠার আগে যাত্রীদের হ্যাজম্যাট স্যুট পরানো হয়েছিল এবং পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়া হয়েছিল |সংগৃহীত

ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের তেনেরিফের কাছে নোঙর করা হান্টাভাইরাস-আক্রান্ত একটি প্রমোদতরী থেকে যাত্রীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে স্পেন।

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছে এবং এমএস হন্ডিয়াস নামের ওই প্রমোদতরীর সব যাত্রীর শরীরেই এখনো কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি।

প্রথম উদ্ধার অভিযানের সময়, একটি লম্বা ক্যামেরার লেন্সে দেখা যায়, যাত্রীরা জাহাজের ডেকে বা জানালার কাছে সাদা মেডিক্যাল মাস্ক পরে ঘোরাঘুরি করছেন।

প্রথম উদ্ধারকারী নৌকাটিতে বেশ কয়েকজন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসেছিলেন এবং ভূমির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ভিডিও ও ছবি তুলছিলেন, যেখানে সাদা সুরক্ষা পোশাক পরা কর্মকর্তারা তাদের সাথে দেখা করেন।

জাতীয়তা অনুযায়ী তাদের দলে ভাগ করা হবে এবং ছোট নৌকায় করে উপকূলে আনা হবে। স্থানীয় বিমানবন্দরে চার্টার্ড বিমান প্রস্তুত থাকবে, যাতে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়।

বিমানবন্দরের টারম্যাকে থাকা যাত্রীদের ফুটেজে দেখা গেছে, এই কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীরা যাত্রীদের পোশাকের ওপর সাদা হ্যাজম্যাট স্যুট পরিয়ে দিচ্ছেন এবং বিমানে ওঠার আগে বিমানের সিঁড়ির পাশেই তাদের ওপর পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন।

সর্বপ্রথম ১৪ জন স্পেনীয় নাগরিক জাহাজ থেকে নামবেন। এরপর ডাচ, গ্রিক এবং জার্মান যাত্রীসহ নেদারল্যান্ডসের ফ্লাইটে যারা যাবেন তারা এবং ক্রুদের একটি অংশ নামবেন।

এরপর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য ফ্লাইটগুলো ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সর্বশেষ ফ্লাইটটি সোমবার অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাহাজে প্রথম এক যাত্রীর মৃত্যুর এক মাস পর, রোববার ভোরে হন্ডিয়াস নামের প্রমোদতরীটি গ্রানাদিয়া বন্দরে প্রবেশ করে।

সূর্য ওঠার পর দেখা যায়- জাহাজটি উপকূলের কাছাকাছি নোঙর করা আছে। সামরিক পুলিশের নৌযান টহল দিচ্ছে এবং ১০০ জনেরও বেশি যাত্রী ও ক্রুকে নামতে সাহায্য করার জন্য উপকূলে একটি বড় কার্যক্রম চলছে।

রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে (গ্রিনিচ মান সময় ৬টা) একটি মেডিক্যাল টিম সবার শরীরে ভাইরাসের কোনো লক্ষণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে জাহাজে ওঠে।

জাহাজটিকে গ্রহণ করার জন্য সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এটিকে সরাসরি তীরে ভেড়ানোর অনুমতি দেয়া হয়নি: এটি দ্বীপের কাছাকাছি আসতেই এর চারপাশে এক নটিক্যাল মাইলের একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।

স্থানান্তরের সময় হন্ডিয়াসের কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য তেনেরিফের ক্যান্ডেলেরিয়া হাসপাতালে কয়েক ডজন নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একটি কঠোর আইসোলেশন সুবিধায় সংক্রামক রোগ মোকাবেলার জন্য টেস্টিং কিট ও ভেন্টিলেটরসহ সম্পূর্ণ সজ্জিত একটি শয্যা রয়েছে।

ওই ইউনিটের প্রধান নিবিড় পরিচর্যা চিকিৎসক মার মার্টিন বলেন, আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সেখানে কর্মীদের জন্য ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক প্রতিরক্ষামূলক স্যুট, মাস্ক এবং গ্লাভস মজুদ করে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আগে কখনো (হান্টাভাইরাস) দেখিনি– তবে এটি একটি ভাইরাস, যার কিছু জটিলতা রয়েছে, যেমনটা আমরা প্রতিদিন সামলে থাকি। এর জন্য আমরা পুরোপুরি প্রশিক্ষিত।

এই ভাইরাসের বিরল আন্দিজ স্ট্রেইনের বিস্তার রোধে গৃহীত জটিল অভিযানটিকে স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন।

শনিবার তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণের ঝুঁকি কম। আমরা বিশ্বাস করি যে আতঙ্ক, ভুল তথ্য এবং বিভ্রান্তি জনস্বাস্থ্য রক্ষার মূল নীতির পরিপন্থী।

শনিবার তেনেরিফের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এই শিল্প বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। স্পেনের সামরিক পুলিশ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা দল উভয়ই সেখানে বড় অভ্যর্থনা তাঁবু স্থাপন করেছে এবং সমুদ্রের পাড়ে যাওয়ার পথটি সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।

জাহাজ ছেড়ে যাওয়া স্পেনীয় নাগরিকদের বিমানে করে মাদ্রিদে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে তাদের গোমেজ উলা সামরিক হাসপাতালে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। সম্পূর্ণ আইসোলেশনে থাকাটা বেশ কষ্টকর হবে। এই ভাইরাসের সুপ্তাবস্থা ৯ সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে এবং স্পেন বা অন্য কোথাও লোকজনকে কতদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যাত্রীদের নামানোর তদারকি করতে বর্তমানে তেনেরিফে থাকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) প্রধান তেদ্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস, এই প্রাদুর্ভাবের প্রতি কর্তৃপক্ষের কঠিন ও কার্যকর প্রতিক্রিয়ার প্রশংসা করেছেন।

এর সাথে আর্জেন্টিনার একেবারে দক্ষিণাঞ্চলের একটি ল্যান্ডফিল সাইটের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা পাখি পর্যবেক্ষকদের কাছে জনপ্রিয়। ইঁদুরের মাধ্যমে সেখানে ভাইরাসটি ছড়ায় এবং মানুষ থেকে মানুষে এর সংক্রমণ হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল, তবে প্রমোদতরীর তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

ডব্লিউএইচও প্রধান উদ্বিগ্ন স্প্যানিশদের অনুরোধ করেছেন- যেন তারা উদ্ধার অভিযানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপর আস্থা রাখেন।

তিনি স্বীকার করেছেন, আপনাদের উদ্বেগ যৌক্তিক, কারণ কোভিডের অভিজ্ঞতার ওই ট্রমা এখনো আমাদের মনে আছে। তবে তিনি যোগ করেছেন যে, ভাইরাসটি কিভাবে কাজ করে এবং যেকোনো সমস্যা এড়াতে স্পেন সরকার যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে, তার কারণে এখন এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম।

হন্ডিয়াসকে তাদের দ্বীপে ঘুরিয়ে আনা হচ্ছে জানতে পেরে স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল।

পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে আশঙ্কা করে শুক্রবার বন্দর শ্রমিকদের একটি দল স্থানীয় পার্লামেন্টের বাইরে জড়ো হয়ে জোরদার প্রতিবাদ জানায়।

এরপর গতকাল অনেক রাতে সাবধানে সাজানো সব পরিকল্পনা মুহূর্তের জন্য বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, যখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো ক্লাভিজো বলেন যে, একদিনের মধ্যে যাত্রী নামানোর কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জাহাজটিকে বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেবেন না। পরবর্তীকালে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

ক্লাভিজো এরপর টিভিতে দাবি করেন যে, হান্টাভাইরাস বহনকারী একটি ইঁদুর মাঝরাতে জাহাজ থেকে নেমে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। এরপর স্বাস্থ্য সচিবকে সামনে এসে জোর দিয়ে বলতে হয় যে এ ধরনের কোনো দৃশ্যপটের ঝুঁকি নেই। সামগ্রিকভাবে, এই দ্বীপের মানুষ আশ্বস্ত বলে মনে হচ্ছে যে ঝুঁকি কম।

তেনেরিফের রাজধানী সান্তা ক্রুজে নিজের সন্তানের সাথে হাঁটতে বের হওয়া জেনিফার নামের এক নারী বলেন, অবশ্যই ভাইরাসটি বিপজ্জনক। তবে তারা বলছে এটি সংক্রমিত হওয়ার জন্য খুব কাছাকাছি সংস্পর্শে আসতে হবে। আমরা যদি সতর্ক থাকি, তবে আশা করি এটি খুব বেশি গুরুতর হবে না।

সবাই তেনেরিফে হন্ডিয়াস থেকে নামবেন না: প্রমোদতরীটিকে নেদারল্যান্ডসে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য প্রায় ৩০ জন ক্রু সদস্য জাহাজে থেকে যাবেন। তবে বেশিরভাগ মানুষের জন্যই অবশেষে সমুদ্রে কাটানো কয়েক সপ্তাহের ভয় ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এখন শুরু হবে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইন। সূত্র : বিবিসি