রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ অবসানে সরাসরি আলোচনার জন্য মুখোমুখি বৈঠকের অনুরোধ জানালেও তিনি এমন বৈঠকের কোনো প্রয়োজন দেখেন না।
বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি একটি খোলাচিঠি পাঠিয়ে পুতিনের সাথে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধকে আবারো যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরে আসার অপেক্ষায় বসে থাকা ‘ভুল’ হবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট একটি যুদ্ধবিরতিরও আহ্বান জানান এবং চিঠিতে কিছু ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় অবস্থান দেখান আবার কিছু ক্ষেত্রে তার বক্তব্যের সুর ছিল বিদ্রূপাত্মক।
পুতিন ওই চিঠিকে ‘অমার্জিত’ বলে অভিহিত করে তার সাথে সরাসরি বৈঠকের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি তার আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন যে, কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির আগে শান্তি আলোচনা হওয়া উচিত।
শুক্রবার (৫ জুন) সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেয়ার সময় জেলেনস্কির প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না- এমন প্রশ্ন করা হলে পুতিন বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি এর কোনো প্রয়োজন দেখছি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি কি মুখোমুখি বৈঠকের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার একটি উপায় ছিল, নাকি এমন একটি উপায় ছিল যাতে মুখোমুখি বৈঠক না হয়? আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টিই সঠিক।’
পুতিনের এই প্রতিক্রিয়া শোনার পর ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ‘রাশিয়া আবারো যুদ্ধকেই বেছে নিচ্ছে।’
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘তিনি (পুতিন) যুদ্ধ শেষ করতে চান না। আমার মনে হয় বিশ্বের অনেক মানুষই এই উত্তরে হতাশ হয়েছে।’
জেলেনস্কির চিঠি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন আবারো তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন যে, যুদ্ধবিরতি হলে ইউক্রেন শুধু নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। যদিও মস্কো যে ছাড় বা শর্ত কিয়েভের কাছে দাবি করেছে, সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেনীয় পক্ষ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামাতে চায়। কিন্তু আমাদের দরকার একটি চুক্তি, যা ছয় কিংবা তিন মাসের জন্য নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর এমন একটি চুক্তি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের কাজ করতে দিন এবং কিছু সমাধান বের করতে দিন। তারপর আমরা দেখা করতে পারি।’
পুতিন বলেন, রাশিয়ার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ হলেই তিনি যুদ্ধ শেষ করবেন।
তিনি আরো বলেন, ‘সামরিক অভিযান একদিন না একদিন শেষ হবেই- এটা আমরা ধরে নিচ্ছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তা তখনই শেষ হবে, যখন আমরা নিজেদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।’
রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও ঝাপোরিজ্জিয়া অঞ্চল থেকে সরে যেতে হবে এবং একইসাথে নেটোতে যোগদানের প্রচেষ্টাও বাদ দিতে হবে।
তবে কিয়েভ কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ইউক্রেনের যুক্তি হলো, মস্কোকে কোনো ধরনের ভূখণ্ডগত ছাড় দিলে ভবিষ্যতে তারা আরো আগ্রাসী হয়ে আবারো আক্রমণ করতে উৎসাহিত হতে পারে।
তারা বলে আসছে যে ক্রাইমিয়া উপত্যকা দখল ও সংযুক্ত করার আট বছর পরই রাশিয়া পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করেছিল।
ভলোদিমির জেলেনস্কি তার চিঠিতে লিখেছিলেন যে, ‘২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বয়সের প্রভাব এখন ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর পড়তে শুরু করেছে।’
একইসাথে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হওয়া ইউক্রেনের হামলাগুলোর কথাও উল্লেখ করেছেন।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সেন্ট পিটার্সবার্গে হওয়া একটি হামলাকে তিনি উপহাস করে ‘একটি সফর’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পুতিন বলেন, চিঠিটিতে ‘কিছু বেশ অমার্জিত মন্তব্য’ ছিল।
জেলেনস্কির চিঠির বিষয়বস্তু কিছু মহলে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি করেছিল। এর মধ্যে হোয়াইট হাউজও আছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যদি দুই নেতা সত্যিই সাক্ষাৎ করেন, তাহলে সেটা দারুণ হবে।’
ইউক্রেন শুক্রবার দাবি করেছে যে তারা আজভ সাগর এবং রাশিয়ার দখলকৃত উপকূলীয় অঞ্চলের পানিসীমায় অবৈধ পণ্য বহনকারী পাঁচটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রভডি বলেছেন, জাহাজগুলো ইউক্রেনীয় শস্য ‘চুরি’ করা এবং জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের কাজে জড়িত ছিল।
ওদিকে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজভ সাগরে দু’টি জাহাজের ওপর হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
তবে হামলাটি কারা চালিয়েছে সে বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। যদিও তারা জানিয়েছে যে, জাহাজ দু’টি আজারবাইজানের মালিকানাধীন ছিল না।
এদিকে, ইউক্রেনের একটি ড্রোন রোমানিয়ার কৃষ্ণ সাগরের একটি বন্দরে বিস্ফোরিত হয়েছে। ইউক্রেনীয় অপারেটরদের দাবি, রাশিয়ার ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা হস্তক্ষেপের কারণে ড্রোনটি নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে গত এক দিনে ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় কমপক্ষে ১৩ জন নিহত এবং আরো ৭০ জন আহত হয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কিয়েভের বাইরে একটি দুগ্ধ কারখানায় হামলার ফলে চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া খেরসনে একটি পেট্রোল স্টেশনে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি



