ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

সমর্থন নিশ্চিত করতে ৩৬ হাজার মেয়রের দ্বারস্থ মেলঁশোঁ

২০২৭ সালের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে প্রয়োজনীয় ৫০০টি মনোনয়ন সমর্থন (পারেনাজ) নিশ্চিত করতে জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ দেশের প্রায় ৩৬ হাজার মেয়রের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি রাজনৈতিক সমর্থন নয়, গণতন্ত্রে বহুমতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ
জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ |সংগৃহীত

আগামী ২০২৭ সালের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে আগাম প্রচারণা শুরু করেছেন বামপন্থী নেতা জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ। লা ফ্রঁস আঁসুমিজ (এলএফআই) দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রায় ৩৬ হাজার মেয়রের কাছে ব্যক্তিগতভাবে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে তিনি তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার জন্য প্রয়োজনীয় পারেনাজ (মনোনয়ন সমর্থন) দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল বিএফএম টিভির সূত্রমতে, ফ্রান্সের প্রচলিত নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে তাকে কমপক্ষে ৫০০ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সমর্থন বা পারেনাজ সংগ্রহ করতে হয়। এই নিয়মটি ১৯৭৬ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে। মেয়র, পার্লামেন্ট মেম্বার, সিনেটর, বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এই পারেনাজ দেয়ার অধিকার রাখেন। প্রয়োজনীয় ৫০০টি পারেনাজ সংগ্রহ করতে না পারলে কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ বলে গণ্য হয় না।

২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ মোট ৯০৬টি পারেনাজ সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেও, সেই সমর্থন আদায়ের প্রক্রিয়া ছিল বেশ কঠিন। অনেক নির্বাচিত প্রতিনিধি রাজনৈতিক চাপ কিংবা বিতর্ক এড়াতে পারেনাজ দিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। ফলে পর্যাপ্ত সমর্থন নিশ্চিত করতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে হয়েছিল।

তবে ২০২২ সালের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারে এলএফআই-এর নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মেলঁশোঁ শুরুতেই প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি সম্ভাব্য পারেনাজের ভিত্তি পেতে পারেন। তারপরও প্রয়োজনীয় ৫০০টি সমর্থন নিশ্চিত করা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তিনি।

মেয়রদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে মেলঁশোঁ লিখেছেন, ‘পারেনাজ সংগ্রহের ধাপটি আবারো আমার প্রার্থিতার সবচেয়ে কঠিন অংশ হয়ে উঠবে। তাই ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের কাছে আমার আবেদন, যাতে আমি ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। আমি আপনাদের কাছে রাজনৈতিক সমর্থন চাইছি না; বরং ফ্রান্সের গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বহুমতের প্রকাশ নিশ্চিত করার সুযোগ করে দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, অনেক মেয়রের জন্য পারেনাজ দেয়া একটি সংবেদনশীল ও বিব্রতকর দায়িত্ব হতে পারে। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেসব মেয়র তার পক্ষে পারেনাজ দেয়ার সম্মতি জানাবেন, তাদের পরিচয় ২০২৭ সালের মার্চে সাংবিধানিক পরিষদে (কঁসেই কঁস্তিত্যুসিওনেল) আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের আগে প্রকাশ করা হবে না। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে।

নিজের আবেদনকে আরো শক্তিশালী করতে মেলঁশোঁ স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় তার রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘লাভেনির আঁ কম্যাঁ’ (সবার জন্য ভবিষ্যৎ) প্রায় ২২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। তার ভাষায়, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে তিনি ফরাসি গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তার মতাদর্শের প্রতি জনগণের উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।

২০২৭ সালের নির্বাচনের জন্য নিজের রাজনৈতিক অঙ্গীকারও চিঠিতে তুলে ধরেছেন তিনি। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিকামী ফ্রান্স গড়ে তোলা, জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বর্তমান পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে ষষ্ঠ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শের ভিত্তিতে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও সব ধরনের বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ।

চিঠির শেষাংশে জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ বলেন, ‘তার প্রস্তাবিত কর্মসূচি একটি সঙ্কটময় সময়ে ফ্রান্সকে পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।’

মেয়রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তাকে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিয়ে ফরাসি জনগণের সামনে একটি বিকল্প রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের সুযোগ করে দিতে। তার মতে, এর মাধ্যমেই জনগণের সার্বভৌম মতামত।