মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও মার্কিন আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়েও তেহরান পাল্টা আঘাত হানার পূর্ণ ক্ষমতা ধরে রেখেছে। বারুদের গন্ধ আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠছে পারস্য উপসাগর। টানা ছয় রাত ধরে একে অপরকে নিশানা করছে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধক্ষেত্রের এই রণক্ষেত্রের খবর দিতে গিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ শুক্রবার ( ১৭ জুলাই) এ চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে।
পত্রিকার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পাদক ড্যান স্যাবাগ তার প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকলেও, ইরানকে পিষে ফেলার মার্কিন খোয়াব এখনো অধরাই রয়ে গেছে। মার্কিন আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়েও তেহরান পাল্টা আঘাত হানার পূর্ণ ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
শুক্রবার যুদ্ধের পারদ চড়েছে আরেক ধাপ। মার্কিন যুদ্ধবিমান, ড্রোন আর যুদ্ধজাহাজ থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ইরানের চাবাহার বন্দরের একটি টাওয়ার ধসে পড়েছে। পুরো এলাকাকে যেন বিচ্ছিন্ন করা যায় সে অভিলাষ নিয়ে হরমুজ প্রণালীর বন্দর আব্বাসের সংযোগকারী মহাসড়ক ও সেতুগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
কিন্তু ইরানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ঘরের মাঠে মার খেয়ে তারা মোক্ষম পাল্টা মার দিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন দোসরদের ওপর। কাতার, বাহরাইন আর কুয়েতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান। কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। মরুভূমির এ দেশটিতে ৯০ শতাংশ পানির জোগান দেয় এই কেন্দ্র। ফলে তেহরানের এ এক আঘাতেই কুয়েতের জনজীবন ও অস্তিত্ব ওলটপালট হয়ে গেছে।
অথচ মার্কিন প্রশাসন ও ইসরাইল বুক ফুলিয়ে দাবি করেছিল, বসন্তকালীন ৩৮ দিনের টানা বোমা হামলায় তারা ইরানের সামরিক কোমর ভেঙে দিয়েছে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বলেছিলেন, ইরানের ‘৯১ শতাংশ অস্ত্র নাকি ধ্বংস’ হয়ে গেছে। কিন্তু খোদ মার্কিন গোয়েন্দা দপ্তরের গোপন নথিতেই বেরিয়ে এসেছে আসল সত্য। গত মে মাসের সেই গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীর ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই আবার চালু করে ফেলেছে ইরান। যুদ্ধের আগের তুলনায় এখনো তাদের ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং লঞ্চার অক্ষত আছে। মাটির তলার গোপন ঘাঁটিগুলো বোমার ধ্বংসস্তূপ দিয়ে সাময়িক আটকে দেওয়া সহজ হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরানি সেনারা তা পরিষ্কার করে আবার রণ-তৎপরতার জন্য তৈরি করে নিয়েছে।
মার্কিন হুংকার যে ফাঁপা, তা প্রমাণ করতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পারস্য উপসাগরের নৌসীমায় মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধকে কাচকলা দেখাচ্ছে। ওমানের কাছ দিয়ে যাওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক নাবিক নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। ওমান উপসাগরে আরেকটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধজাহাজের পাহারা ছাড়া এই সাগরে কোনো ট্যাংকারই নিরাপদ নয়। এর জের ধরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক জাহাজ চলাচল কমে মাত্র তিনটিতে ঠেকেছে। আর বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭৫.৫০ ডলার থেকে লাফিয়ে ৮২ ডলারে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ না করেও, শুধু বন্ধ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েই বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে ইরান। শুক্রবারও আরও একটি ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে তারা।
এদিকে, হোয়াইট হাউসের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মাইকেল কার্পেন্টার হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের কাছে এই চোরাবালি থেকে বের হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই। ন্যাটোর সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানের নেতাদের ‘আবর্জনা’ আর ‘অসুস্থ’ বলে গালিগালাজ করলেও, স্থলযুদ্ধ ছাড়া ইরানকে নতজানু করা অসম্ভব। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই হিম্মত বা ইচ্ছা কোনোটিই নেই। অবরোধ ধরে রাখতে ইউএসএস বক্সার উভচর গ্রুপের ২২০০ মেরিন সেনা মোতায়েন থাকলেও তাতে কাজ হচ্ছে না।
মার্কিন রণনীতি এখন চরম বিভ্রান্তিতে। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে খাড়গ দ্বীপ দখল বা ইরানের গভীর পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা মারার যে নীলনকশা আঁকা হচ্ছে, তা আদতে কোনো কাজে আসবে না। কারণ খাড়গ দ্বীপ দখল করলেও ইরানি ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে তা ধরে রাখা মার্কিনীদের পক্ষে অসম্ভব হবে। উপরন্তু, কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রের (সিএসআইএস) হিসাব বলছে, একনাগাড়ে হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরই আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর অর্ধেক এবং মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র এক-তৃতীয়াংশ ফুরিয়ে এসেছে।
আগামী সপ্তাহে ইরানের সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ট্রাম্পের বোমা মারার হুমকি আসলে এক ধরনের যুদ্ধাপরাধের শামিল। এ তৎপরতা বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলবে এবং কুয়েতের শোধন কেন্দ্রে হামলার মতো ইরানও মার্কিন স্বার্থে আরও ভয়ানক পাল্টা আঘাত হানবে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রক্সেন ফারমানফারমাইয়ান বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইর সপ্তাহব্যাপী জাতীয় শোকযাত্রা ও জানাজা প্রমাণ করে ইরানের ভেতরের ঐক্য কতটা মজবুত। যুদ্ধ হয়তো আর বেশিদিন টেনে নেওয়া দুই পক্ষের জন্যই কঠিন। কারণ রসদ দুই তরফেই কমছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শেষ কথা হলো—যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, অবাস্তব লক্ষ্য নিয়ে সেই যুদ্ধ শেষ করা ততটাই কঠিন। এই লড়াইয়ে কাউকেই সহজে নকআউট করা যাবে না।



