তথ্য ফাঁস

ইসরাইলের গোপন গোয়েন্দা ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

মূলত এটি ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অতিগোপন ‘ইউনিট ৯৯০০’ এর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সহজ কথায়, ‘ইউনিট ৯৯০০’ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিওস্পেশিয়াল অ্যাজেন্সির সমকক্ষ সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট, যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিগত উপায়ে ভৌগোলিক ও অবস্থানভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। যুদ্ধক্ষেত্রে কোন কোন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে হবে, কোথায় বোমা ফেলতে হবে, শত্রুপক্ষের সামরিক যাতায়াত কেমন এবং ভূখণ্ড বা মাটির গঠন কেমন- এই সমস্ত জটিল সামরিক গোপন তথ্য ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করে ইসরাইলি পাইলট এবং পদাতিক বাহিনীকে সরবরাহ করে এই ইউনিট।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাইলের অতিগোপন সামরিক গোয়েন্দা দফতর
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাইলের অতিগোপন সামরিক গোয়েন্দা দফতর |ইন্টারনেট

তেল আবিবের এক আবাসিক এলাকায় আছড়ে পড়া ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরাইলের একটি অতিগোপন সামরিক গোয়েন্দা দফতর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বাহিনীর সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই এই হামলা চালিয়েছে তেহরান।

স্পাইটকের বরাত দিয়ে ইসরাইলের টেকনিক্যাল ওয়েবসাইট ক্যালক্যালিস্টেক ডটকম সম্প্রতি এই তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় ঘটনাটি একটি আবাসিক এলাকায় সাধারণ বিস্ফোরণ হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও এর আসল লক্ষ্যবস্তু যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোয়েন্দা কেন্দ্র ছিল, তা এতদিন সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল!

ইরানের একটি মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের তথাকথিত অভেদ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ফাঁকি দিয়ে তেল আবিবের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওই গোপন জিওস্পেশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা জিওইন্ট ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানে। অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপন এই জাতীয় ভূ-স্থানিক তথ্য-প্রযুক্তি কেন্দ্রটি একটি সাধারণ আবাসিক এলাকার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, যা এই হামলায় কেঁপে ওঠে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেল আবিবের ঐতিহাসিক লেভ হা’ইর জেলায় ঘটা এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের খবর সে সময় বিশ্বগণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছিল। শক্তিশালী সেই বিস্ফোরণে একটি বহুতল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় এবং চারপাশের বেশ কয়েকটি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনায় মেরি অ্যান ভেলাসকুয়েজ দে ভেরা নামের ফিলিপাইনের এক সাধারণ নারী পরিচর্যাকারী নিহত হন।

তবে নতুন এই প্রতিবেদনে যে তথ্যটি ফাঁসের মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে তা হলো, দুর্ঘটনাস্থল এবং মূল বিস্ফোরণের প্রভাববলয় থেকে মাত্র ৫০ ফুট দূরত্বের মধ্যে থাকা ইসরাইলের ন্যাশনাল জিওডেটিক ইনস্টিটিউট বা জাতীয় ভূ-স্থানিক প্রতিষ্ঠানটি এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মূল শিকার ছিল এবং বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কায় কেন্দ্রটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এটি সাদামাটা কোনো বেসামরিক দফতর নয়, মূলত ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অতিগোপন ‘ইউনিট ৯৯০০’ এর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সহজ কথায়, ‘ইউনিট ৯৯০০’ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিওস্পেশিয়াল অ্যাজেন্সির সমকক্ষ সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট, যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিগত উপায়ে ভৌগোলিক ও অবস্থানভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। যুদ্ধক্ষেত্রে কোন কোন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে হবে, কোথায় বোমা ফেলতে হবে, শত্রুপক্ষের সামরিক যাতায়াত কেমন এবং ভূখণ্ড বা মাটির গঠন কেমন- এই সমস্ত জটিল সামরিক গোপন তথ্য ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করে ইসরাইলি পাইলট এবং পদাতিক বাহিনীকে সরবরাহ করে এই ইউনিট।

সহজভাবে বলতে গেলে, এ ইউনিটটি যুদ্ধক্ষেত্রের ‘চোখ’ হিসেবে কাজ করে এবং সেনাবাহিনীকে কোথায় কী ঘটছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে। গাজা এবং লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর চলমান সমস্ত বিমান ও স্থল অভিযানের পেছনের মূল চালিকাশক্তি হলো এই দফতর থেকে পাঠানো ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি মানচিত্র এবং ড্রোনের রিয়েল-টাইম তথ্য। এমনকি ‘ইউনিট ৯৯০০’ একটি বিশেষ নিম্ন-উড্ডয়ন ড্রোন ইউনিটও পরিচালনা করে, যা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে।

স্পাইটকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে ঘটনার পরপরই ইসরাইলের কঠোর সামরিক সেন্সরশিপ কর্তৃপক্ষ এই স্পর্শকাতর গোয়েন্দা ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি বা বিস্ফোরণের স্থান থেকে এর দূরত্বের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে সে সময় প্রকাশিত কোনো সংবাদেই সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি বা কোনো সেনা কর্মকর্তা হতাহত হয়েছে কিনা তা বিন্দুমাত্র উল্লেখ করা হয়নি।

তেল আবিবের ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকার ঠিক মাঝখানে এমন একটি অতিসংবেদনশীল সামরিক গোয়েন্দা ঘাঁটি লুকিয়ে রাখার বিষয়টি এখন ইসরাইলের সাধারণ নাগরিক ও বেসামরিক মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতির ধরন এবং নিখুঁত নিশানা বিশ্লেষণ করে স্পাইটকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানি এই হামলায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, বরং তেল আবিবের বুকে লুকিয়ে থাকা ইসরাইলের এই অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল গোয়েন্দা কেন্দ্রটিই ছিল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত লক্ষ্যবস্তু।