আন্তর্জাতিক নৌযুদ্ধের নীতিকে তোয়াক্কা না করে এক বিপজ্জনক ও আগ্রাসী অধ্যায়ের সূচনা করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এবার সার্বভৌম একটি দেশের অভ্যন্তরে সরাসরি হামলা চালাতে চালকবিহীন ড্রোন যুদ্ধজাহাজ বা ইউএসভি ব্যবহার করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দম্ভোক্তি করে জানিয়েছে, সোমবার ইরানের বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটির ভেতরে ঢুকে তিনটি ‘কোরসেয়ার’ সি ড্রোন আঘাত হেনেছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, তারা ওখানকার একটি সাবমেরিন ও জাহাজ মেরামত কারখানাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে সেন্টকম এই হামলাকে জায়েজ করতে চাইছে। তবে এই হামলা আন্তর্জাতিক পানিসীমায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কৃষ্ণসাগরে সি ড্রোনের ব্যবহার দেখা গেলেও, মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক দূরনিয়ন্ত্রিত এই ধরনের চালকহীন ঘাতক ড্রোনের প্রকাশ্য ব্যবহার এটাই প্রথম। এর আগে ওয়াশিংটন তাদের ইউএসভিগুলোকে মূলত নজরদারি ও উদ্ধারকাজের মতো অ-প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করার দাবি করলেও, এই হামলা তাদের সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করল।
মার্কিন যুদ্ধবাজদের অস্ত্র জোগানদাতা ‘সারোনিক’
ইরানের ওপর এই কাপুরুষোচিত হামলার পেছনে রয়েছে টেক্সাসভিত্তিক মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘সারোনিক’ এবং তাদের তৈরি স্বয়ংক্রিয় ঘাতক যান ‘কোরসেয়ার’। ৭.৩ মিটার দীর্ঘ এই সি ড্রোনটি ১,০০০ নটিক্যাল মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে হামলা চালাতে পারে। ঘণ্টায় ৩৫ নটেরও বেশি গতিতে ছুটতে পারা এই ড্রোন প্রায় ৪৫৩ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম। মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এটি অন্য দেশের নৌসীমা লঙ্ঘন করে নিখুঁত আত্মঘাতী হামলা চালাতে পারে।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মার্কিন পেন্টাগনের প্রত্যক্ষ মদদে সারোনিকের এই যুদ্ধকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক উত্থান চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তারা লুইজিয়ানার ‘গালফ ক্রাফট’ কিনে নেয় এবং পরে সেখানে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ায়। ২০২৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর মার্কিন নৌবাহিনী সারোনিকের সাথে ৩৯২ মিলিয়ন ডলারের বড় অংকের চুক্তি করে। মার্কিন নৌবাহিনীর সেক্রেটারি জন ফেলান স্বীকার করেছেন, প্রথাগত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও আমলাতান্ত্রিক তদারকি এড়িয়ে মাত্র ১২ মাসেরও কম সময়ে একে প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে চূড়ান্ত মরণাস্ত্র হিসেবে উৎপাদনে আনা হয়েছে। বর্তমানে এই মার্কিন যুদ্ধবাজ প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৯.২৫ বিলিয়ন ডলারে।
আধুনিক নৌযুদ্ধের আড়ালে মার্কিন কূটকৌশল
বিলিয়ন ডলারের প্রথাগত যুদ্ধজাহাজের চেয়ে এই ড্রোনগুলো তৈরি করা অনেক সাশ্রয়ী। সবচেয়ে বড় বিষয়, এতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনো নাবিকের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে না। ফলে ওয়াশিংটন কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই যেকোনো দেশের সার্বভৌম নৌসীমা বা পানিসীমা লঙ্ঘন করে এমন বিপজ্জনক আগ্রাসন চালানোর লাইসেন্স পেয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেন কম খরচের সি ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান ও ইয়েমেনের হাউজিরাও পশ্চিমাদের আগ্রাসন ঠেকাতে সমুদ্রে নিজস্ব প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য মাসখানেক আগে ওমান উপকূলে একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার উদ্ধারকাজে এই কোরসেয়ার ড্রোন ব্যবহার করার নাটক সাজিয়েছিল। ২০২১ সালে গঠিত মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ ‘টাস্ক ফোর্স ৫৯’ এটি পরিচালনা করছে। তবে বন্দর আব্বাসের এই হামলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয়। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আন্তর্জাতিক নৌপথে বিগ ব্রাদারসুলভ নিজেদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এবং যেকোনো সার্বভৌম দেশকে কোণঠাসা করতে স্বয়ংক্রিয় ঘাতক ড্রোনকে তাদের মূল রণকৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সূত্র: আনাদোলু অ্যাজেন্সি



