আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ছয় মাস : আসলে জয়ী কে?

রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো কয়েক হাজার মানুষ। বিশষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পুরো বিশ্বে সামরিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন হয়ে গেছে। নতুন জোট গঠিত হচ্ছে, আবার পুরোনো জোটে ধরেছে ভাঙন।

সোহানুর রহমান
একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে চতুর্মুখী নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান। দীর্ঘ ছয় মাস আগে শুরু হওয়া সেই অসম যুদ্ধ আজও শেষ হয়নি। যেখানে বিশ্বের কাছে যুদ্ধের ফলাফল ছিল প্রকাশিত সত্য, সেখানে ইরানের নব্য উত্থান পাল্টে দিয়েছে সকল হিসাব-নিকাশ। পুরো বিশ্বের বুকে কাঁপন ধরিয়ে নিজেদের শিরদাঁড়া উঁচিয়ে ধরেছে তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্রের মুহুর্মুহু হামলায় একদিকে শীর্ষ নেতাসহ ঝরেছে হাজারো প্রাণ, ধ্বংস হয়েছে সামরিক ঘাঁটি, কেঁপেছে তেলের বাজার, বন্ধের পথে হরমুজ প্রণালী। মূলত ওয়াশিংটন চেয়েছিল ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন থামাতে, ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে, এমনকি বদলে দিতে চেয়েছিল তেহরানের নেতৃত্বও। কিন্তু অর্জিত হয়নি ওয়াশিংটনের সেই রাজনৈতিক লক্ষ্য।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত, শীর্ষ নেতৃত্বে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় ধাক্কাসহ সকলপ্রকার ভয়াবহ ক্ষতির পরও টিকে আছে তেহরানের শাসনব্যবস্থা। আর সেই শাসনব্যবস্থায় ভর করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। যেখানে হরমুজ প্রণালী হয়ে উঠেছে দেশটির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

কিন্তু ছয় মাস পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই যুদ্ধে আসলে জয়ী কে?

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সমগ্র বিশ্বকে চমকে দেয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। এছাড়াও দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে বহু শিশুকে হত্যা করেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু প্রশাসন।

যদিও এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এই সংঘাত মাত্র ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ স্থায়ী হবে। কিন্তু সেই সময় ছাড়িয়ে পার হয়েছে ছয়টি মাস। আর এই কয়েক মাসের মধ্যেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে আরো কয়েকটি ফ্রন্টে।

যার প্রভাব পৌঁছে গেছে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত। একদিকে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ সংকট, অন্যদিকে তেহরানের হরমুজ প্রণালির উপরে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ নিয়ন্ত্রণ দুই পক্ষকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। চলমান যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান এই পানিপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু সেই পরিবহন সংকট আঘাত করেছে পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে।

রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো কয়েক হাজার মানুষ। বিশষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পুরো বিশ্বে সামরিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন হয়ে গেছে। নতুন জোট গঠিত হচ্ছে, আবার পুরোনো জোটে ধরেছে ভাঙন।

তবে এখন প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্র কি তার যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে?

কোনোপ্রকার স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই হঠাৎই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা প্রথমে দাবি করেছিলেন, ইরানে হামলা চালানো হয়েছে মূলত আগাম আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানকে দেয়া প্রস্তাবগুলো এবং পরে ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দেয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বেশ কয়েকটি লক্ষ্য সামনে চলে আসে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শেষদিকে যোগ দেয়। এরপর ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দিয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আবারো দাবি করে যে- তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মাত্র কয়েক সপ্তাহ দূরে রয়েছে।

তাই দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বারবার হামলা চালানো শুরু করে মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথবাহিনী। ফলে স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এতো হামলার পরেও ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে মনে করা হয়, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।

এজন্য ট্রাম্প প্রশাসন চেয়েছিল, ইরান তাদের এই মজুদকৃত ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে এবং ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। কিন্তু ইরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। তবে একপর্যায়ে তৃতীয় কোনো দেশের কাছে এই মজুত হস্তান্তরের সম্ভাবনার ব্যাপারে তেহরান কিছুটা আগ্রহী বলে মনে হয়েছিল।

এদিকে ইরান তার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর জোর দেয়া শুরু করে। যদিও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রয়োজন হয়।

পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন যে- মার্কিন সেনারা প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে আসতে পারে। এটি বাস্তবায়ন করা হলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সামরিক অভিযান হতে পারত।

তবে ১৭ জুন উভয় পক্ষের স্বাক্ষর করা সমঝোতা স্মারকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়। যদিও এমন প্রতিশ্রুতি ইরান আগেও দিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা স্মারকের অস্পষ্ট ভাষা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে সমঝোতা স্মারকটি কার্যত ভেঙে পড়ে।

এ বিষয়ে উত্তর ক্যারোলিনার বেলমন্ট অ্যাবি কলেজের অধ্যাপক ও সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ক্লার্ক সামার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ন্যায্যভাবেই দাবি করতে পারে যে- এসব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে ইরান কতদিনের মধ্যে আবার এগুলো পুনর্গঠন করতে পারবে, তা বলা কঠিন।’

তবে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক আলাম সালেহ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি এখনো টিকে আছে।

তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর আগেই হেরে গেছে।’ তার মতে, এই যুদ্ধের প্রচেষ্টাও প্রমাণ করে যে- গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধেও ওয়াশিংটন তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

ইরানে সরকার পরিবর্তন
যুদ্ধের প্রথম দিন অর্থ্যাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় যখন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ আরো কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। তখন থেকেই ইরানে নতুন শাসন কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করতে থাকেন ট্রাম্প। যদিও এর মাত্র দুই দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটে গেলে সেটিই সবচেয়ে ভালো বিষয় হবে। ফলে

যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সময় ট্রাম্প ইরানের পাশ্চাত্যপন্থীদের ইসলামী শাসনব্যবস্থা সরিয়ে পুনরায় রাজার শাসনে ফিরতে আহ্বান জানান। সেই লক্ষ্যে পাশ্চাত্যপন্থীদের দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে তাদের স্বাধীনতার লড়াই করতে এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার আহ্বান জানান।

কিন্তু বাস্তবে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদল হলেও সেই পুরোনো কাঠামোই থেকে যায়। নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি।

অধ্যাপক ক্লার্ক সামার্সের মতে, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যটি হয়তো আগে থেকে সুপরিকল্পিত ছিল না। বরং পরিস্থিতির চাপে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্তটি যুক্ত হয়েছিল।

অধ্যাপক আলাম সালেহ বলেন, ‘একটি দেশের নেতাদের হত্যা করা কখনোই কৌশলগত সাফল্য হতে পারে না, তবে এটি কৌশলগত একটি সফল অভিযান হতে পারে।’

আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা
এছাড়াও বহু আগে থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অক্ষগুলো সমর্থন দিয়ে আসার অভিযোগ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষ হলো মূলত ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যাদেরকে ইরান অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হাউসি, গাজার হামাস এবং ইরাক ও সিরিয়ার বেশ কয়েকটি ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী।

যুক্তরাষ্ট্র বারবার হুঁশিয়ারি দিলেও ইরান এসব গোষ্ঠীকে দেয়া সমর্থন বন্ধ করেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকেও এই দাবিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে ইরানের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও অংশ নেয়। এতে করে লেবাননে ব্যাপক হামলা চালায় আইডিএফ।

ফলে লেবাননকেও যু্দ্ধাবসান আলোচনার আওতায় না আনা হলে ইরান এই বিষয়ে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়। এদিকে হাউসিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবরোধ শুরু করেছে, যেটাকে ইরানের প্রতি সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি
এদিকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করাটাও ছিল এই হামলার অন্যতম লক্ষ্য। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল যে- তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেবে। একই সাথে ইরানের নৌবাহিনীকেও ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওয়াশিংটন।

এরপরেই ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের প্রায় ৮২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র তারা ধ্বংস করে দিয়েছে এবং দেশটির নৌবাহিনী মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এপ্রিল মাসে তিনি আরো দাবি করেন, ওই সময় পর্যন্ত ইরানের ১৫৮টি নৌযান আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় কয়েক ডজন হামলার চালায়। তবুও ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে যাচ্ছে।

এমনকি সর্বশেষ গত জুলাইয়ে ইরান একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার আঘাতে জর্ডানে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার দাবিটিও জুলাইয়ের সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ইরানের তেল নিয়ন্ত্রণ
গত জুনে দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছালে সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এছাড়াও জুন মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল খার্গ দ্বীপ দখল করে নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইরান ভূখণ্ডের একটি অংশও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।

তাহলে এই ছয় মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কী পেল, কী হারাল?

যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবিগুলো তুলেছিল, তার বাইরে সংঘাত চলার সাথে সাথে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের ক্ষেত্র সামনে এসেছে। ক্ষেত্রগুলো-

হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ
যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। আর এই অবরোধ কার্যকর করতে ইরান প্রণালীতে বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি জাহাজ চলাচল করতো সেখানে বর্তমানে তা কমে গড়ে প্রায় পাঁচটিতে নেমে এসেছে।

এই সরু পানিপথটি মূলত ইরান ও ওমান এই দুই দেশের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। যা পারস্য উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য সমুদ্রের দিকে যাওয়ার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইরানের অনুমতি ছাড়া যেসব জাহাজ এই পানিপথ অতিক্রমের চেষ্টা করেছে, তাদের ওপরই হামলা চালানো হয়েছে।

এদিকে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে ইরানের বন্দরগুলোর ওপরে নিজস্ব নৌ অবরোধ আরোপ করে। যা এখনো বহাল রয়েছে। এদিকে ট্রাম্প বহুবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য তীব্র ভাষায় দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তেহরান তাতে সাড়া দেয়নি।

বর্তমানে ইরান ও ওমান পানিপথটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। কেন না যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো। যা এখন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

এদিকে হরমুজ নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান চলতি সপ্তাহে ওমানের সাথে একটি জাহাজ চলাচলের জন্য একটি রুট খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। তবে এটার ওপরে ইরানের আংশিক নিয়ন্ত্রণও থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটি।

অন্যদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েছে এবং এখন এটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বাস্তবে জাহাজ চলাচল এখনো সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ অতিক্রমের চেষ্টা করলে ইরান এখনো হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরান হরমুজ প্রণালীকে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

এদিকে অধ্যাপক সালেহে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করে।

অর্থনৈতিক প্রভাব
ইরান: যুদ্ধের কারণে ইরানের সবচেয়ে বড় ধসটা নেমেছে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের জেরে দেশটির মুদ্রা রিয়াল কার্যত ধসে পড়েছে। ফলে যুদ্ধের মধ্যেই ব্যাপকভাবে খাদ্যের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে কমেছে দেশটির তেল রপ্তানি আয়। আল-জাজিরার তথ্যমতে, এই অবরোধের কারণে ইরানের তেল থেকে আয় কমেছে কমপক্ষে ৬ বিলিয়ন ডলার।

তেহরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে ছিল। যদিও যুদ্ধবিরতির কারণে কিছু সময়ের জন্য অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমেছিল। তবে এত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাঝেও চীন ও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কে ধরে রেখেছে দেশটি। ফলস্বরূপ চীন ও রাশিয়া উভয়ই বিভিন্নভাবে এই যুদ্ধে ইরানকে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।

এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত সপ্তাহে বলেন, ইরান এ ধরনের পরিস্থিতিতে কীভাবে টিকে থাকতে হয় তা জানে।

যুক্তরাষ্ট্র: শুধু ইরান নয়, যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক চাপ বিষিয়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবনও, তেলের দাম বাড়ায় জ্বালানি স্টেশনগুলোতে বেড়েছে মার্কিন ভোক্তাদের চাপ। ফলে এই সংঘাত ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে মার্কিনিদের কাছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস কর্তৃক জুলাইয়ের একটি জরিপে দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিনি এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। এই ক্ষোভ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে অধ্যাপক সামার্স বলেন, অনেক আমেরিকান হয়তো যুদ্ধের কথা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু পেট্রোলের দাম বাড়লে তারা সেটা খুব ভালোভাবেই মনে রাখে। ইতোমধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়াসহ বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে গ্যাসোলিনের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।

মিত্রদের সাথে সম্পর্ক
ইরান: জর্ডানসহ প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান। এর ফলে আঞ্চলিকভাবে ইরানের ভাবমূর্তি অনেকটাই কমেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে দেশটি। ফলে এসব দেশ ইরানের হামলাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র: এদিকে চলমান সংঘাতে মিত্রদের থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি ওয়াশিংটন। ট্রাম্প সরাসরি আহ্বান জানানোর পরও ন্যাটো মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে স্পেন ও ইতালি এই যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছে। শুধু তাই নয়, ইউরোপে ইসরাইলের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র জার্মানিও সংঘাতের সমালোচনা করেছে। এদিকে অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্সও অবরোধ কার্যকরে জাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি।

এছাড়াও এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়াও সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া এড়াতে উপসাগরীয় মিত্ররাও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি।

সামরিক সক্ষমতা
ইরান: চলমান সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে বহু ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এখনো সস্তা শাহেদ ড্রোনের উৎপাদন ও ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে দেশটি। ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি মার্কিন বাহিনী।

ট্রাম্পের দাবি, এখন পর্যন্ত ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় ৮২ শতাংশ কমে গেছে। তবে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে সক্ষম।

এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, আনুমানিক ১ হাজার ২২১ জন ইরানি সামরিক সদস্য নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র: এদিকে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা হতাহত এবং ৭৫০ জনেরও বেশি সেনার আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে পেন্টাগন।

অধ্যাপক সামার্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশ কম। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা যায়, পেন্টাগনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল কিছু অস্ত্রের মজুত ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। যদিও ওয়াশিংটন এসব দাবি অস্বীকার করেছে। মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বছরে মাত্র কয়েক ডজন উৎপাদন করা হয়। যার প্রতিটির মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার।

ইতোমধ্যেই আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা রেথিয়নের সাথে ২২.৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। যে চুক্তিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বছরে ৬০টি থেকে বাড়িয়ে ১ হাজারেরও বেশি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তাহলে এই যুদ্ধে আসলে জয়ী কে?
বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই। কেন না যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অবকাঠামোগতভাবে ধ্বংস করতে পারলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিকগুলোতে পরাস্ত করতে পারেনি। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধে কৌশলগতভাবে টিকে থাকলেও অর্থনৈতিক ও সামরিক খাতে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলাম সালেহ বলেন, ‘আসলে এই যুদ্ধে তাদের কেউই কিছু অর্জন করতে পারেনি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও মধ্যম শক্তির দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বাস্তব কৌশলগত অর্জনে রূপ দিতে পারেনি। অপরদিকে ইরান টিকে আছে বলেই তাকে বিজয়ী বলা যায় না।

অর্থাৎ দীর্ঘ ছয় মাসের এই যুদ্ধে দুই পক্ষই বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েও সব লক্ষ্য পূরণ ব্যর্থ। অন্যদিকে ইরান ধ্বংসের মুখে টিকে থাকলেও, তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সম্পর্ক আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তবে এই যু্দ্ধের ফলে পরোক্ষভাবে লাভবান হয়েছে চীন ও রাশিয়া। সম্ভবত এই যুদ্ধে ওয়াশিংটনের দুর্বলতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে দেশ দুটি। তাছাড়াও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সংঘাত হলে নিজেদের সামরিক ক্ষেত্র কিভাবে সাজাতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে বেইজিং-মস্কো জুটি। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে বিশেষ সুবিধা পাবে চীন।

কারণ যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তাদের শেষ বিমানবাহী রণতরীটিও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী নেই। সেই সুযোগটাই এখন চীনের হাতিয়ার।

তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতের লাভ-ক্ষতির হিসাব সমাধানহীনভাবেই থেকে গেছে।