যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা কি ভেঙে পড়ছে?

সমঝোতাটি মূলত যুদ্ধ থামানোর জন্য করা হলেও এটি যুদ্ধের কারণগুলো সমাধান করতে পারেনি। বরং সমঝোতার ভাষায় ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা রাখা হয়েছিল, যাতে উভয় পক্ষ নিজ নিজভাবে এর ব্যাখ্যা দিতে পারে। শুরুতে এটি যুদ্ধ বন্ধে সহায়ক হলেও পরে সেই অস্পষ্টতাই বড় সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৮ জুলাই ঘোষণা দেন যে, জুনের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding–MoU) কার্যত "শেষ"। তবে একই সাথে তিনি ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি। এই দ্বৈত অবস্থানই দেখায় যে দুই দেশ এখন এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে, যেখানে যুদ্ধও শেষ হয়নি, আবার শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সমঝোতাটি মূলত যুদ্ধ থামানোর জন্য করা হলেও এটি যুদ্ধের কারণগুলো সমাধান করতে পারেনি। বরং সমঝোতার ভাষায় ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা রাখা হয়েছিল, যাতে উভয় পক্ষ নিজ নিজভাবে এর ব্যাখ্যা দিতে পারে। শুরুতে এটি যুদ্ধ বন্ধে সহায়ক হলেও পরে সেই অস্পষ্টতাই বড় সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। এখন ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েই সামরিক চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।

গত তিন সপ্তাহে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির অস্থায়ী অনুমতি বাতিল করে এবং সামরিক হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় রাতেও ইরানে হামলা করে এবং ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর জবাব দেয়া হবে। ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে।

তবু কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। যদিও আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে, বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর পর জাতীয় শোকের কারণে, তারপরও দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকরা "ধূসর অঞ্চল" হিসেবে বর্ণনা করেছেন—যেখানে যুদ্ধ ও কূটনীতি একই সাথে বিদ্যমান।

এই সমঝোতা শুরু থেকেই দুর্বল ছিল। কারণ এটি যুদ্ধ থামালেও মূল বিরোধগুলোর সমাধান করেনি। বিশেষ করে তিনটি প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়—হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, লেবাননে ইরানের ভূমিকা এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদে প্রবেশাধিকার। এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি না হওয়ায় পরে উভয় পক্ষই নিজস্ব ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে।

সমঝোতার পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনাকেও দুই দেশ ভিন্নভাবে দেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করা, হরমুজে অবাধ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা, ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা কমানো। অন্যদিকে ইরান মনে করেছিল, যুদ্ধের সময় যে কৌশলগত সুবিধা অর্জিত হয়েছে, সেটিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করার এটাই সুযোগ। এই দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষই বর্তমান সঙ্কটকে তীব্র করেছে।

সবচেয়ে বড় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় এর ওপর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত থাকুক এবং ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হোক। কিন্তু ইরানের মতে, হরমুজে তার প্রভাবই দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল ভিত্তি। তাই তেহরান মনে করে, এই নিয়ন্ত্রণ হারালে কূটনীতিতেও তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।

সমঝোতার একটি ধারা অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে এবং এ সময় কোনো ফি নেবে না। কিন্তু এখানেই ব্যাখ্যার পার্থক্য দেখা দেয়। ইরান "ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার" অংশটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি হিসেবে দেখে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব দেয় "নিরাপদ ও অবাধ চলাচল" এবং "কোনো ফি নয়" অংশে। ফলে একই ধারার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো জটিল করেছে।

ইরানের দৃষ্টিতে, তাদের তত্ত্বাবধান ছাড়া যদি জাহাজ চলাচল করে, তাহলে যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত কৌশলগত সুবিধা নষ্ট হবে। এজন্যই তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলাচলকারী কিছু জাহাজে হামলা চালায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার সহযোগিতায় ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে বিকল্প নৌপথ চালুর চেষ্টা করে। ইরান এটিকে সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে।

একই ধরনের বিরোধ লেবানন ইস্যুতেও দেখা যায়। ইরান মনে করে, সমঝোতা অনুযায়ী লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ এবং সেনা প্রত্যাহারে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে পৃথক একটি কাঠামো তৈরি করে। তেহরানের মতে, এটি সমঝোতার চেতনাবিরোধী।

ইরানের কাছে হরমুজ, লেবানন এবং জব্দ করা সম্পদ—এই তিনটি বিষয় আলাদা নয়; বরং একই বৃহত্তর কৌশলগত লড়াইয়ের অংশ। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান আগে তার সব চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ছেড়ে দিক, কিন্তু বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পরে দেবে। ফলে ইরান মনে করছে, সমঝোতা বাস্তবায়ন একপাক্ষিকভাবে তাদের ক্ষতির দিকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বিপরীত আশঙ্কায় রয়েছে। ওয়াশিংটনের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজে সামরিক প্রভাব এবং আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তি বজায় রেখে ইরানকে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা দিলে ভবিষ্যতে তা আরো বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলে দুই দেশই প্রথমে অপর পক্ষের ছাড় চায়, কিন্তু নিজেরা আগে ছাড় দিতে রাজি নয়। এই "কে আগে ছাড় দেবে" প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার কারণ।

যদি এই সমঝোতা সম্পূর্ণ ভেঙে যায়, তাহলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তবে সেটি আগের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি হবে না। কারণ উভয় পক্ষই আগের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে আরও বেশি জানে। একইভাবে ইরানও বুঝে গেছে, কোন কোন স্থানে আঘাত করলে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সর্বাধিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।

এ অবস্থায় ইরান শুধু হরমুজ নয়, ইয়েমেনের হুথিদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দাব প্রণালীতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ আরো বড় সঙ্কটে পড়তে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ বা আরো বড় সামরিক অভিযানের পথে যেতে পারে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো, সমঝোতা ভেঙে গেলে উভয় দেশের কট্টরপন্থীরা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ইরানে বলা হবে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে কেবল নতুন চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে দাবি উঠবে, ইরান কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে; তাই আরো কঠোর সামরিক অভিযানই একমাত্র সমাধান।

সংঘাত এড়াতে বিশ্লেষকরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। প্রথমত, দুই পক্ষকে সমঝোতার নিজস্ব ব্যাখ্যা সামরিক শক্তি দিয়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতারকে দ্রুত হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও বিকল্প নৌপথ তৈরির প্রচেষ্টা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখবে। এর মাধ্যমে অন্তত সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুটি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

সবশেষে—যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারলেও গ্রহণযোগ্য মূল্যে তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে না। একইভাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে পারলেও ওয়াশিংটনকে নিজের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ দুই দেশই একে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু কাউকেই চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে পারে না। তাই সমঝোতা ভেঙে গেলে তারা আবারও অস্ত্রের মাধ্যমে একই অমীমাংসিত বাস্তবতা পরীক্ষা করবে—যার মূল্য হবে আরো বেশি।

(ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ৯ জুলাই ২০২৬-এর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সারসংক্ষেপ অনুদিত)