যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন বিস্তার: কোন দিকে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য?

যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইসরাইলে আরো নিখুঁত ও জোরালো আঘাত হানার কৌশল হিসেবেই জর্ডানকে পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।

তেহরানেরমার্কিন বিরোধী দেয়াল লিখনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ইরান এক নারী
তেহরানেরমার্কিন বিরোধী দেয়াল লিখনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ইরান এক নারী |সংগৃহীত

ইরানের সংবাদ মাধ্যম ওয়ানা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত এক নতুন ধাপে পা দিয়েছে। এই লড়াইয়ের ভৌগোলিক পরিধি দিন দিন বাড়ছে। দুই পক্ষই নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। পাশাপাশি তাদের রণকৌশলেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে পুরো অঞ্চলটি যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শুধু ইরানের উপকূলীয় এলাকার মধ্যে তাদের সামরিক অভিযান সীমাবদ্ধ রাখছে না। তারা এখন ইরানের মূল ভূখণ্ডের বেশ গভীরে হামলা চালানো শুরু করেছে, যা সামনে আরো বাড়তে পারে, আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং নির্দিষ্ট কিছু সামরিক স্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের কিছু ইরানি দ্বীপ দখল করার মতো স্থল অভিযানের পরিকল্পনা নিয়েও জনমনে আলোচনা শুরু হয়েছে।

পাল্টা জবাব দিতে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও সম্পদের ওপর হামলার পরিধি এবং কৌশল অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পাশাপাশি এখন জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর বেশি নজর দিচ্ছে তেহরান। গত ৪০ দিনের লড়াইয়ের ধরন বদলে এবারই প্রথম সিরিয়ায় থাকা মার্কিন অবস্থানগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইসরাইলে আরো নিখুঁত ও জোরালো আঘাত হানার কৌশল হিসেবেই জর্ডানকে পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। এর পাশাপাশি ইরান সাম্প্রতিক সপ্তাহে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা সন্ত্রাসী দলগুলোর আস্তানায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সেখানে থাকা গুপ্তঘাতকদের নির্মূল করতে বিশেষ কমান্ডো অভিযানও চালানো হয়েছে। এই অভিযানের তীব্রতা বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি।

পারস্য উপসাগরে ইরানের মূল লক্ষ্য এখন কুয়েত ও বাহরাইন। কুয়েতে শুধু মার্কিন সেনার উপস্থিতির কারণেই ইরান ক্ষুব্ধ নয়, বরং তেহরানের ধারণা, ইরানি অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার একটা বড় অংশ কুয়েতের লজিস্টিক সুবিধা ব্যবহার করে করা হচ্ছে। কাতার বা সৌদি আরব মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে কিছুটা কড়াকড়ি করলেও কুয়েত ও বাহরাইন তা করেনি। ফলে তেহরানের স্পষ্ট বার্তা—যে দেশই মার্কিন সামরিক অভিযানকে নিজের মাটি ব্যবহার করতে দেবে, তারা ইরানের পাল্টা আক্রমণের আওতায় পড়বে। যুদ্ধ আরো ছড়ালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমানও চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ নতুন সামরিক কৌশলে ইরান শুধু শত্রুর অস্ত্র নয়, তাদের কমান্ড সেন্টারগুলো ধ্বংস করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এদিকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে আনসারুল্লাহ (হাউসি) বিদ্রোহীরা নতুন করে সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে। তারা সৌদি আরবে হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অবরুদ্ধ করে চাপ বাড়ানোর ছক কষছে। অন্যদিকে, ইসরাইল এখন মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ওয়াশিংটন যেভাবে ইসরাইলের অস্ত্রভাণ্ডার ঢেলে সাজাচ্ছে, তাতে পরবর্তী ধাপে ইসরাইলের সরাসরি এই সংঘাতের ফ্রন্টলাইনে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক রক্তক্ষয়ী পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।